আনাদের দেশ কৃষিনির্ভর – একথা প্রায় সকলেরই জানা। তবে এই কথার গভীরতা তখনই উপলব্ধি করা সম্ভব, যখন আমরা দেখি দেশের ৫০ শতাংশেরও বেশি মানুষ সরাসরি কৃষির উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে।আর এটি শুধুমাত্র খাদ্য উৎপাদনের দায়ভার নয়, ভারতের অর্থনীতিতেও কৃষির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও এটাই সত্য, এই বিশাল জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, চাষের খরচ বৃদ্ধি এবং বাজারে ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার মতো সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকেন বারবার।
এই কারণে কেন্দ্রীয় সরকার বিভিন্ন সময় কৃষকদের সহায়তার জন্য একাধিক প্রকল্প চালু করেছে, যেগুলির মূল লক্ষ্য হল কৃষকের আয় নানা ভাবে সহায়তা করা, চাষের আধুনিকীকরণ করা, পণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা এবং বার্ধক্যে একটি সম্মানজনক জীবনযাপন নিশ্চিত করে দেওয়া।
এই পোস্টে আমরা এমন ৫টি কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালিত কৃষি প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি, যেগুলি ২০২৫ সালের কৃষি পরিস্থিতিতে চাষিদের কাছে হয়ে উঠেছে আশার আলো ।
১. প্রধানমন্ত্রী কৃষক সম্মান নিধি (PM-KISAN)
২০১৮ সালে চালু হওয়া এই প্রকল্পটি ভারতের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দিতে কেন্দ্র সরকারের অন্যতম বড় উদ্যোগ হয়ে আছে।
এই প্রকল্পে প্রতিটি কৃষক পরিবারকে বছরে ₹৬,০০০ টাকা সরাসরি তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। এই অর্থটি দেওয়া হয় তিন কিস্তিতে (₹২,০০০ করে) এবং পুরো প্রক্রিয়া হয় DBT (Direct Benefit Transfer) এর মাধ্যমে ।
এই প্রকল্পের মূল সুবিধাগুলি হল:
- প্রতি বছর ₹৬,০০০ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়
- সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যায়
- চাষের জন্য বীজ, সার, যন্ত্রপাতি কেনার কাজে খরচ করা সম্ভব
- দেশের প্রায় ১১ কোটির বেশি কৃষক পরিবার এই প্রকল্পের আওতায় উপকৃত হয়ে থাকে
কীভাবে আবেদন করবেন?
আপনার নিকটবর্তী CSC সেন্টার বা রাজ্যের কৃষি দফতরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে আবেদন করা যায়। প্রয়োজন হবে জমির দলিল, আধার ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ডিটেলস ইত্যাদি।
২. কৃষি উড়ান যোজনা (Kisan Udan Yojana)
২০২০ সালে চালু হওয়া এই প্রকল্পটি মূলত কৃষিপণ্যের দ্রুত পরিবহনের জন্য তৈরি করা হয়েছে।
বিশেষত উত্তর-পূর্ব ভারত, পাহাড়ি ও প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চলের কৃষকদের ফসল, মাছ, ফুল বা দুধ মূল্যের হ্রাস পাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল – শহর পর্যন্ত নিয়ে আসতে না পারা। ঠিক সেই জায়গায় UDAN স্কিমের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার দেশের ৫৮টি বিমানবন্দর থেকে কৃষিপণ্য পরিবহনের সুযোগ করে দিয়েছে।
এই প্রকল্পের সুবিধাগুলি:
- কৃষিপণ্যের বিমানপথে দ্রুত সরবরাহ করা
- নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম থাকে
- বাজারে ভালো দাম পাওয়া সম্ভব হবে
- কৃষকের লাভজনক বিক্রয় সুনিশ্চিত হবে
কাদের জন্য সবচেয়ে উপযোগী?
বিশেষ করে যারা দূরবর্তী অঞ্চল থেকে দুধ, মাছ, ফুল, সবজি বা ফল পাঠাতে চান, এই স্কিমে অংশ নিয়ে লভ্যাংশ পেতে পারেন অনেকে
৩. প্রধানমন্ত্রী কৃষক মানধন যোজনা (PM-KMY)
এই স্কিমটি একটি কৃষকদের জন্য পেনশন প্রকল্প, যা কৃষকদের বার্ধক্যে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে তৈরি আনা হয়েছে ।
১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সী কৃষকরা এই স্কিমে নিজের নাম নথিভুক্ত করতে পারেন এবং মাসে ₹৫৫ থেকে ₹২০০ টাকা অবধি অবদান রাখা যাবে। কেন্দ্র সরকার ওই সমপরিমাণ টাকা যোগ করে। এরপর ৬০ বছর বয়সে কৃষক প্রতি মাসে ₹৩,০০০ টাকার পেনশন দেওয়া হবে।
এই স্কিমের বৈশিষ্ট্য:
- বার্ধক্যের জন্য নিশ্চিত মাসিক পেনশন পাওয়া
- সম্পূর্ণ সরকারি সহায়তায় হবে
- কম মাসিক বিনিয়োগে স্থায়ী সুবিধা পাবেন
- দৈনন্দিন খরচ মেটাতে সহায়ক হবে
কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ভারতের অধিকাংশ কৃষক পেনশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত আছে। এই স্কিমটি সেই ফাঁক ভরাট করে ঋাকবে।
৪. প্রধানমন্ত্রী কৃষি সেচ যোজনা (PMKSY)
কৃষির জন্য সেচ হল চাষের প্রাণভোমরা। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হল – “More Crop Per Drop”।
বিশেষ করে শুষ্ক অঞ্চল, বর্ষা-নির্ভর এলাকা বা যেখানে চাষাবাদে পর্যাপ্ত জলের অভাব থাকে – সেখানে ড্রিপ ও স্প্রিংকলার সেচ ব্যবস্থা চালু করা হয় এই স্কিমের আওতায়। এছাড়াও রয়েছে জল সংরক্ষণ, খাল সংস্কার ও জলাশয় তৈরির মতো কার্যক্রম করা হয়।
এই প্রকল্পের সুবিধাগুলি:
- আধুনিক সেচ প্রযুক্তির সাহায্যে জলের ব্যবহার হ্রাস করা
- উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা
- কৃষকের জলসংকট থেকে মুক্তি দেওয়া
- মাটি ও পরিবেশ সংরক্ষণের সহায়তা করা
উপযুক্ত কারা?
যে সব কৃষকদের জমিতে পর্যাপ্ত জল থাকে না বা যারা Micro-irrigation ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করতে চান তাদের হবে উপযুক্ত ।
৫. প্রধানমন্ত্রী ধনধান্য কৃষি যোজনা (PM-DhanDhan Yojana)
সম্প্রতি এই প্রকল্পটি ২০২৫ সালের জুলাই মাসে চালু হয়েছে এবং দেশের ১০০টি পিছিয়ে থাকা কৃষি জেলার উন্নয়ন লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে।
এই স্কিমে কৃষকদের দেওয়া হচ্ছে আধুনিক বীজ , প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও সরাসরি বিপণন সুবিধা সহ ফ্রীতে। এর পাশাপাশি চাষিদের শুধুমাত্র ফসল ফলানো নয়, সেটিকে বিক্রি করা এবং বাজারে পৌঁছনোর সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলছে এই প্রকল্প।
মূল সুবিধা:
- আধুনিক কৃষি প্রশিক্ষণ
- উন্নতমানের বীজ দেওয়া
- কোল্ড স্টোরেজ ও প্রসেসিং সুবিধা বৃদ্ধি
- কৃষি মার্কেটিংয়ে সরাসরি যুক্ত হওয়া
কে উপকৃত হবেন?
যারা পিছিয়ে থাকা কৃষি জেলার কৃষক আছেন, যারা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে ইচ্ছুক বা নতুন কৃষি উদ্যোগ গড়তে চান।














