ভারতের নির্বাচন কমিশন অবশেষে দেশজুড়ে ভোটার তালিকার “নিবিড় ও বিশেষ সংশোধন” বা SIR (Special & Intensive Revision) প্রক্রিয়া চালু করার ঘোষণা করে ফেললো।এদিকে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশনার পরে, নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট করে দিল কবে থেকে রাজ্যে SIR শুরু হচ্ছে।
আমরা সকলে জানি, এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হল ভোটার তালিকার গুণগত মান বজায় রাখা এবং অবৈধ ভোটারদের নাম তালিকা থেকে মুছে দেওয়া। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, অসম সহ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে বিদেশি অভিবাসীদের নাম ভোটার তালিকায় থাকা নিয়ে বহু বছর ধরেই বিতর্ক দেখা দিয়েছিল। এবার কমিশন সেই সমস্যা সমাধানের জন্য চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের রায়: আধার কার্ড বাধ্যতামূলক
বিহারের SIR প্রক্রিয়া ঘিরে বিতর্কের মাঝেই সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন।এদিন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি ও সূর্য কান্তর ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, ভোটার পরিচয়ের প্রমাণ হিসেবে আধার কার্ডকে গ্রাহ্য করতে হবে। অর্থাৎ, ভোটার যাচাইয়ের জন্য আধার কার্ডের গুরুত্ব এখন আইনি বৈধতা দেওয়া হয়েছে।
ঠিক এই রায়ের পরই নির্বাচন কমিশন তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে– বিহারের মত সারা দেশেই SIR প্রক্রিয়া শুরু করা হবে, এবং তা চলতি বছরের শেষ ভাগেই বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানানো হয়।
কেন SIR প্রয়োজন?
প্রায় দুই দশক পর ফের দেশে এই প্রক্রিয়া শুরু হতে চলেছে। যদিও পশ্চিমবঙ্গে শেষবার SIR হয়েছিল ২০০২ সালে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার ফলে ভোটার তালিকায় বহু ভুলভাল হয়েছে, অনেক মৃত ব্যক্তির নাম, ভুয়ো নাম, এবং বহিরাগতদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগ দেখা গেছে। তাছাড়া নতুন ভোটারদের নাম যুক্ত করাও দরকার রয়েছে।
SIR প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য:
- পুরোনো ও ভুয়ো নাম বাদ দিয়ে দেওয়া
- অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্তকরণ করা
- নতুন ভোটারদের অন্তর্ভুক্তি করা
- এলাকার ভিত্তিতে আপডেট ভোটার তালিকা প্রস্তুত করে ফেলা
- ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সাহায্য করা
বিদেশি অভিবাসীদের ঘিরে উদ্বেগ
বাংলাদেশ ও মায়ানমার থেকে আসা অবৈধ অভিবাসীদের উপস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক স্তরে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলে আসছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও ত্রিপুরায় এই ইস্যু অত্যন্ত সংবেদনশীল হলে মনে করা হচ্ছে। এবার নির্বাচন কমিশন সরাসরি বলেছে – ভোটার তালিকায় এমন ব্যক্তিদের নাম রাখা যাবে না যাদের ভোটার হিসাবে প্রামাণ্য পরিচয়পত্র নেই।
এই কারণে জন্মস্থান পরীক্ষা ও ঠিকানা যাচাই হবে কঠোরভাবে।
বিহারে বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিত
বিহারে সম্প্রতি যখন SIR প্রক্রিয়া চালু করা হয়, তখন প্রায় ৬৫ লক্ষ ভোটারের নাম খসড়া তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়ে থাকে। এ নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয় গোটা দেশে। এদিকে রাজনৈতিক দলগুলি দাবি তোলে, ভোটার পরিচয়ের জন্য আধার কার্ড গ্রহণ না করে থাকলে, অনেক প্রকৃত ভোটারও বাদ পড়ে যাবেন।
এই যুক্তিকেই ভিত্তি করে সুপ্রিম কোর্ট বলে থাকেন– “আধার বাদ দেওয়া যাবে না। এটি একটি বৈধ এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিও বটে।” এই মন্তব্যের পর কমিশন এবার দেশজুড়ে আধারকে অন্যতম প্রামাণ্য নথি হিসেবে গ্রহণ করে সিদ্ধান্ত জানিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের প্রস্তুতি: ফের SIR প্রক্রিয়া শুরু
শেষবার পশ্চিমবঙ্গে ২০০২ সালের পর এই প্রথম SIR চালু হতে চলেছে। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক ইতিমধ্যেই জেলার ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে বৈঠক করে ব্লক ও ওয়ার্ডভিত্তিক তালিকা যাচাইয়ের কাজ ইতিমধ্যে শুরু করার নির্দেশও দিয়েছেন। এছাড়া নির্বাচনী ওয়েবসাইটে এলাকাভিত্তিক পুরোনো তালিকাও প্রকাশ করেছে।
এদিকে এবার নতুন SIR প্রক্রিয়ায় আধার, রেশন কার্ড, স্বাস্থ্যসাথী কার্ড ইত্যাদি নথিকেও প্রামাণ্য নথি হিসেবে বিবেচনা করার প্রস্তাব দিয়েছেন রাজ্য সরকার।
পদ্ধতি কী হবে?
এই SIR প্রক্রিয়ায় কমিশনের অফিসাররা ঘরে ঘরে গিয়ে ভোটার কার্ড যাচাই করবেন। ঠিকানার প্রমাণ, জন্মের তথ্য, নাগরিকত্বের দলিল – সবই এক্ষেত্রে দেখতে চাওয়া হবে। যে সমস্ত ভোটারের নথি প্রমাণযোগ্য নয়, তাদের নাম খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে।
যে নথিগুলি গ্রহণযোগ্য হতে পারে:
- আধার কার্ড
- পাসপোর্ট
- ড্রাইভিং লাইসেন্স
- রেশন কার্ড
- স্বাস্থ্যসাথী কার্ড (যদি অনুমোদিত হয়)
- বিদ্যুৎ বিল/জল বিল
- জন্ম সনদ
- শিক্ষাগত সার্টিফিকেট
সাধারণ নাগরিকদের কী করতে হবে?
তাই বর্তমানে সাধারণ নাগরিকদের উচিত এখনই প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত করে রাখা। যাদের আধার বা রেশন কার্ডে ঠিকানা ভুল রয়েছে, তারা সংশোধন করিয়ে নেওয়া ভালো। যাদের নাম এখনও ভোটার তালিকায় আসেনি, তারা নতুন ভোটার হিসাবে নাম তোলার জন্য আবেদন করে নেন।
বিশেষ করে দেশজুড়ে ভোটার তালিকায় স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। আধার কার্ডকে প্রামাণ্য নথি হিসেবে গ্রহণের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর কমিশনের হাতে আইনি সমর্থনও দেওয়া হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় যেন কোনও প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক বঞ্চিত না হয়ে পড়ে সে বিষয়েও সতর্ক থাকা জরুরি।














