Bangla News Dunia, বাপ্পাদিত্য:– বিহারের পর এবার বাংলার পালা ৷ আগামী অগস্ট মাসেই এরাজ্যে চালু হয়ে যেতে পারে SIR বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন অর্থাৎ, ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন ৷ যেখানে মৃত ভোটার, ঠিকানা বদল, দু’জায়গায় থাকা নাম ও ভুয়ো ভোটারদের নাম বাতিলের প্রক্রিয়া চলবে ৷ এর ফলে পুরোপুরি স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরি হবে পশ্চিমবঙ্গে ৷
রাজ্যের মুখ্য নির্বাচন কমিশনের এক আধিকারিকের মতে, জাতীয় নির্বাচন কমিশনের থেকে এমনটাই ইঙ্গিত মিলেছে ৷ আর তার থেকে অনুমান করা হচ্ছে, রাজ্যে আগামী মাসের 15 তারিখের মধ্যে চালু হতে পারে এসআইআর ৷ উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলার ক্ষেত্রে একের পর এক পদক্ষেপ করছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন ৷
বিশেষ করে কয়েকদিন আগেই রাজ্য সচিবালয় নবান্নে পাঠানো জাতীয় নির্বাচন কমিশনের দু’টি নির্দেশিকা ৷ যেখানে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরকে একটি স্বতন্ত্র দফতর হিসেবে ঘোষণা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ৷ সেই সঙ্গে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরের জন্য পৃথক বাজেট তৈরি করতে বলেছে কমিশন ৷
আর দ্বিতীয়টি হল, স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনের কাজের জন্য ব্লক লেভেল অফিসার বা বিএলও-দের বিশেষ ভাতা দেওয়ার নির্দেশ ৷ এই ধরনের একাধিক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে ৷ আর এর থেকেই স্পষ্ট যে, বিহার মডেল অনুসরণ করে পশ্চিমবঙ্গেও শুরু হবে ‘স্যার’, যা শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা ৷
একদিকে যখন জাতীয় নির্বাচন কমিশন এবং রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর SIR-এর কাজ চালু করার সবরকম প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন রাজ্যের শাসকদল এই প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা শুরু করেছে ৷ তৃণমূল কংগ্রেস যে এই নিয়ে কড়া অবস্থান গ্রহণ করছে, তা স্পষ্ট ভাষায় একুশে জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে জানিয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ এ রাজ্যে বিজেপি ছাড়া বাকি বিরোধী দলগুলিও SIR-এর বিরোধিতায় সরব হয়েছে ৷ প্রশ্ন উঠছে, রাজ্যের শাসকদলই যখন এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে, তখন কমিশনের পক্ষে কতটা সহজ হবে এই প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ?
মূলত অনুপ্রবেশকারী, ভোটারদের স্থানান্তর, পরিযায়ী শ্রমিক, মৃত ভোটার, ডুপ্লিকেট এপিক কার্ড নম্বর-সহ আরও একাধিক ভুলভ্রান্তি থেকে যায় ভোটার তালিকায় ৷ সেই সব সংশোধন করে ভোটার তালিকাকে একেবারে ত্রুটিমুক্ত করতেই SIR করে জাতীয় নির্বাচন কমিশন ৷ উল্লেখ্য, 2002 সালে পশ্চিমবঙ্গে শেষবার হয়েছিল SIR ৷
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার আসার পর নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একাধিক রদবদল আনা হয়েছে ৷ আরও কড়াকড়ি হয়েছে নির্বাচনী প্রক্রিয়া ৷ আর তার সাক্ষী হল সাম্প্রতিক সময়ের কালীগঞ্জের বিধানসভা উপনির্বাচন ৷ কারণ, কালীগঞ্জ বিধানসভা উপনির্বাচনের সময় নতুন করে ভোটার তালিকা সংশোধন করা হয় ৷ সেই সময় প্রায় 5 হাজার 840 জন ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল ৷ সেই সঙ্গে 3 হাজারের বেশি ভোটারের নাম যুক্ত হয়েছিল তালিকায় ৷ সেভাবেই 2026-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকাকে ঝাড়াইবাছাই করতেই এই পদক্ষেপ করা হচ্ছে ৷
প্রসঙ্গত, SIR অর্ডার অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের মধ্যে একটি সংশোধিত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে ৷ সেই তালিকা দেখে যদি কোনও ইলেক্টর কিংবা কোনও স্বীকৃত রাজনৈতিক দল, কারও নাম বাদ পড়া কিংবা কোন আপত্তি থাকে, তা জানাতে পারবে ৷
নির্বাচন কমিশন এও জানিয়ে দিয়েছে যে, SIR করতে গিয়ে যদি কোনও বুথ লেভেল অফিসার (BLO) বা সমীক্ষক কোনোভাবে আক্রান্ত হন, সেক্ষেত্রে সরাসরি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে এফআইআর করার অধিকার দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট জেলা নির্বাচনী আধিকারিক এবং রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরকে ৷
নিয়ম অনুযায়ী, SIR-এর ক্ষেত্রে অফলাইন ও অনলাইন দু’রকমভাবেই ফর্ম ফিলাপের মাধ্যমে যাচাই করার সুযোগ থাকছে ৷ অফলাইনে বিএলও-রা বাড়ি-বাড়ি যাবেন ফর্ম নিয়ে ৷ সেই ফর্ম ফিলাপ করে, তার সঙ্গে প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হবে ৷ তবে, যাঁরা কর্মসূত্রে বাইরে থাকেন ৷ তাদের জন্য অনলাইন সুবিধাও থাকছে ৷ সেখানে অনলাইনে ফর্ম ফিলাপ করে নথি জমা দেওয়া যাবে ৷
অনলাইন এনুম্যারেশন বা গণনা ফর্ম কারা ফিলআপ করতে পারবেন
কমিশন সূত্রে খবর, বাংলা থেকে ভিনরাজ্যে ও বিদেশে কাজ করতে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকদের সঠিক সংখ্যা কত, সেই তথ্য রাজ্য ও কেন্দ্রের কাছে নেই ৷ এমনকি তাঁদের মধ্যে ঠিক কতজন বৈধ ও অবৈধ ভাবে বাইরে গিয়েছেন, তারও সঠিক তথ্য নেই প্রশাসনের কাছে ৷
জানা যাচ্ছে, শুধুমাত্র সরকার স্বীকৃত 36টি এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে যাওয়া দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকদের তথ্য রয়েছে ৷ আর সেই হিসেব বলছে, বর্তমানে বাংলা থেকে 1 লক্ষ 79 হাজার 597 জন শ্রমিক কাজ করছেন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কুয়েত, কাতারের মতো মোট 17টি দেশে ৷
যে সমস্ত শ্রমিকরা ‘ECR’ বা ‘ইমিগ্রেশন চেক রিকোয়ার্ড’ তালিকাভুক্ত দেশগুলিতে সরকার অনুমোদিত এজেন্সির মাধ্যমে গিয়েছেন, শুধুমাত্র তাঁদের তথ্য রয়েছে প্রশাসনের কাছে ৷ কিন্তু, এই হিসেবের বাইরেও রয়েছে আরও অনেকে ৷ এরা মূলত ভুয়ো এজেন্সির মাধ্যমে, বা আত্মীয়স্বজনের আমন্ত্রণে কিংবা ট্যুরিস্ট ভিসায় পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছেন ৷ এরা সকলেই অনলাইনে এনুম্যারেশন ফর্ম ফিলআপ করে বৈধ নথি জমা দিতে পারবে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের সাইটে ৷
এই অফলাইন ও অনলাইন এনুম্যারেশন বা গণনা ফর্ম ফিলাপ প্রক্রিয়ায় যদি কোনও ভুয়ো ভোটার কার্ড বা জাল তথ্য পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে এফআইআর দায়ের করার নির্দেশ দিয়েছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন ৷
এবার জানা যাক, এরাজ্যে SIR-এর ক্ষেত্রে কী কী নথির প্রয়োজন পড়বে ? বিহারের ক্ষেত্রে মোট 11টি নথির প্রয়োজন পড়েছিল ৷ রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকদের দফতর থেকে পাওয়া তথ্য অনযায়ী, এনুম্যারেশন বা গণনা ফর্মের সঙ্গে বিহারের মতোই 11টি নথির প্রয়োজন পড়বে ৷ কমিশনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, এই 11টি নথির মধ্যে যেকোনও একটি বা দু’টি বা তার বেশি নথি দিয়ে বা গণনা ফর্ম পূরণ করতে হবে ৷ অর্থাৎ, এনুম্যারেশন ফর্মের সঙ্গে জমা দিতে হবে ৷
পশ্চিমবঙ্গে SIR-এর ক্ষেত্রে কী কী নথি লাগতে পারে
- যেকোনও পরিচয়পত্র/কেন্দ্রীয় সরকার/রাজ্য সরকার/রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার কর্মী/পেনশন প্রাপকের পেনশন পেমেন্ট অর্ডার ৷
- 01.07.1987 আগের সরকার/স্থানীয় কর্তৃপক্ষ/ব্যাংক/ডাকঘর/ভারতীয় জীবন বিমা নিগম/রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা কর্তৃক ভারতের প্রদত্ত যে কোনও পরিচয়পত্র/শংসাপত্র/নথি ৷
- উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত জন্মের শংসাপত্র বা বার্থ সার্টিফিকেট ৷
- পাসপোর্ট ৷
- স্বীকৃত পর্ষদ/বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রদত্ত ম্যাট্রিকুলেশন সার্টিফিকেট/শিক্ষাগত যোগ্যতার শংসাপত্র ৷
- রাজ্যের উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত স্থায়ী বাসস্থানের শংসাপত্র ৷
- বনভূমি অধিকার শংসাপত্র ৷
- উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অন্যান্য অনগ্রসর সম্প্রদায়/তফসিলি জাতি/তফসিলি উপজাতি বা অন্য কোনও জাতিগত সংশাপত্র ৷
- জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (NRC) (যাদের ক্ষেত্রে হয়েছে) ৷
- রাজ্য/স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দ্বারা তৈরি করা পারিবার পঞ্জি (ফ্যামিলি রেজিস্টার) ৷
- কোনও জমি/বাড়ি বরাদ্দের সরকারি শংসাপত্র বা জমি/বাড়ির দলিল ৷
প্রাথমিকভাবে এই নথিগুলির প্রয়োজন পড়তে পারে ৷ নির্বাচন কমিশনের তরফে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হলে, সেখানে নথির সংখ্যা বাড়তে পারে ৷ উপরে লেখা তালিকার নথিগুলির মধ্যে একটি/দু’টি/তার বেশি প্রয়োজন হতে পারে জন্ম সালের উপর নির্ভর করে ৷
এদিকে SIR হওয়ার চিন্তায় একরকম ঘুম উড়েছে বাংলার সীমান্তবর্তী মানুষজনের একাংশের ৷ নির্বাচন কমিশন সূত্রে খবর, গত এক সপ্তাহে রাজ্যের সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে ফর্ম-6 বা ভোটার তালিকায় নাম তোলার আবেদনপত্র জমা পড়েছে প্রায় 75 হাজার ৷ সাধারণভাবে এক সপ্তাহে যে সংখ্যাটি 25 হাজারের মধ্যে থাকে ৷ তবে এবার এক সপ্তাহের মধ্যেই সেই সংখ্যা তিনগুণ হয়েছে ৷ মূলত কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, মালদা, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর, নদিয়া, উত্তর 24 পরগনা, দক্ষিণ 24 পরগনা জেলায় ভোটার তালিকায় নতুন করে নাম নথিভুক্ত করার আবেদনপত্র জমা পড়েছে ৷
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় নির্বাচন কমিশন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিহারে প্রায় 99 শতাংশ ভোটদাতাদের SIR প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ৷ সেখানে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে 21.6 লক্ষ মৃত, 31.5 লক্ষ অন্যত্র চলে গিয়েছেন, 7 লক্ষ যাঁদের একের বেশি বিধানসভা কেন্দ্রে নাম আছে এবং এক লক্ষ ভোটার যাঁদের কোনও হদিশ মেলেনি ৷ এছাড়া 7 লক্ষের কিছু বেশি ভোটারের কাছ থেকে এখনও ফর্ম জমা পড়েনি ৷
আরও পড়ুন:- ১ অগস্ট থেকে UPI-এর একাধিক নিয়মে পরিবর্তন, আপনি জানেন তো?
আরও পড়ুন:- শুধু মহিলাদের নয়, এখন পুরুষদের জন্য গর্ভনিরোধক বড়ি ! কিভাবে খেতে হবে ? জেনে নিন













