সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারত ও চীনের সম্পর্ক এক নতুন মোড় নিয়েছে। ২০২০ সালের গালওয়ান উপত্যকার উত্তেজনার পর এই প্রথম, চীনের একজন উচ্চ-পর্যায়ের কর্মকর্তা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই, ভারত সফর করেছেন। এই সফরটি কেবল কূটনৈতিক বরফ গলানোর ইঙ্গিতই দিচ্ছে না, বরং এর ফলস্বরূপ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে যা ভারতের শিল্প ও কৃষি খাতের জন্য অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক। একটা সময় ছিল যখন আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক খুব ভালো যাচ্ছিল, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সমীকরণ বদলেছে এবং আমেরিকার বিরুদ্ধে ভারত ও চীন একত্রিত হচ্ছে। এই সফরের পর চীন ভারতের উপর থেকে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রীর উপর রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর ও তার গুরুত্ব
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র ভারত সফরটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সাথে বৈঠক করেন। এই বৈঠকে প্রধানত সীমান্ত উত্তেজনা কমানো, সেনা সরানো এবং ভবিষ্যতে গালওয়ানের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করার বিষয়ে আলোচনা হয়। এই বৈঠকের পরেই চীন ভারতের জন্য প্রয়োজনীয় বেশ কিছু পণ্যের উপর থেকে তাদের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কথা ঘোষণা করে, যা ভারতের জন্য একটি বড় জয়।
কী কী বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা সরানো হলো?
চীনের এই সিদ্ধান্তে ভারতের তিনটি প্রধান খাত ব্যাপকভাবে উপকৃত হবে। যে সমস্ত সামগ্রীর উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে সেগুলি হল:
- রেয়ার আর্থ ম্যাগনেট (Rare Earth Magnets): এই চুম্বকগুলি বৈদ্যুতিক গাড়ির মোটর, বায়ু টারবাইন, ইলেকট্রনিক্স এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরির জন্য অপরিহার্য। চীন এই চুম্বকের বিশ্বের বৃহত্তম সরবরাহকারী। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে ভারতের গাড়ি শিল্পে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
- সার (Fertilizers): ভারত তার প্রয়োজনীয় সারের প্রায় ৮০% চীন থেকে আমদানি করে। ডিএপি (DAP), এমএপি (MAP) এবং ক্যালসিয়াম নাইট্রেটের মতো সারের উপর চীন নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, যার ফলে ভারতের কৃষি, বিশেষ করে উদ্যানপালন খাত ব্যাপক ঝুঁকির মুখে পড়েছিল।
- টানেল বোরিং মেশিন (Tunnel Boring Machines): ভারতের বিভিন্ন পরিকাঠামো প্রকল্প, যেমন মেট্রো এবং হাই-স্পিড রেললাইন তৈরির জন্য এই মেশিনগুলি অত্যন্ত জরুরি। এই মেশিনগুলির অভাবে অনেক প্রকল্পের কাজ থমকে গিয়েছিল।
এই পদক্ষেপের পেছনের কৌশল
এই সিদ্ধান্তের পিছনে দুই দেশেরই কৌশলগত চিন্তাভাবনা কাজ করেছে।
- ভারতের দৃষ্টিকোণ: পূর্ববর্তী মার্কিন প্রশাসনের দ্বারা আরোপিত শুল্কের কারণে ভারত আমেরিকাকে একটি নির্ভরযোগ্য বাণিজ্য সঙ্গী হিসেবে ভাবতে পারছিল না। তাই ভারত তার বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে বৈচিত্র্য আনতে এবং মার্কিন বাজারের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে চাইছে।
- চীনের দৃষ্টিকোণ: চীন চায় না যে ভারত আমেরিকার আরও কাছাকাছি চলে যাক। তাই, বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নত করে এবং সীমান্তে উত্তেজনা কমিয়ে চীন ভারতকে মার্কিন শিবির থেকে দূরে রাখতে চাইছে।













