দেবীর বিসর্জনের দিন পথ দেখান মুসলিম ধর্মালম্বীরা , জানুন চাঁচল রাজবাড়ীর পুজোর কথা

By Bangla News Dunia Desk - Pallab

Published on:

Bangla News Dunia , পল্লব চক্রবর্তী : রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দুর্গাপুজো নিয়ে রয়েছে হাজারও লোককথা। অন্যতম মালদার ঐতিহ্যবাহী চাঁচল রাজবাড়ি। রাজবাড়িতে অবশ্য বিভিন্ন প্রশাসনিক দফতর খোলা হয়েছে। তবে রাজমন্দির আগের মতোই রয়েছে। এখানে মা উমা দেবী চণ্ডী রূপে পুজিত হন। পুজোর মূল বিশেষত্ব হল, বিসর্জনের সময় আজও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ মায়ের যাত্রাপথে আলো দেখায়।

তখন সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগ। উত্তর মালদার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে রাজ করতেন রাজা রামচন্দ্র রায়চৌধুরি। বিহারের কিছু অংশও তাঁর রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। দোর্দণ্ডপ্রতাপ হলেও প্রজাদরদী এবং ধর্মপ্রাণ হিসেবে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়েছিল। গঙ্গা-মহানন্দা দু’পাড়ের উর্বরা জমির চাষ পরিদর্শন, প্রজাদের সুখ-দুঃখের খবর নেওয়া ছিল তাঁর রোজনামচা। একবার তিনি যখন রাজত্ব দেখতে বেরিয়ে বাইরে রাত কাটাচ্ছিলেন, তখন তাঁকে স্বপ্নাদেশ দেন দেবী চণ্ডী। তিনি আদেশ দিয়েছিলেন, মহানন্দার সতীঘাটায় তাঁর চতুর্ভূজা অষ্টধাতু নির্মিত মূর্তি রয়েছে। রাজমাতাকে দিয়ে সেই মূর্তি নদী থেকে তুলে রাজাকে তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আদেশ পেয়ে সকালেই সতীঘাটায় চলে যান রাজা। স্বপ্নাদেশে বর্ণিত জায়গায় নদীতে নেমে রাজমাতা তুলে আনেন দেবী চণ্ডীর মূর্তি।

avilo home

সতীঘাটা থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে রাজবাড়িতে এনে প্রতিষ্ঠা করেন চাঁচলের রাজা রামচন্দ্র। রাজবাড়িতে শুরু হয় দেবীর নিত্যপুজো। পরবর্তীতে ফের দেবীর স্বপ্নাদেশ পান রাজা। সেই মতো সতীঘাটায় মাটির ঘর ও খড়ের ছাউনি দিয়ে মন্দির তৈরি করা হয়। ওই বছর থেকেই শুরু হয় রাজবাড়ির দুর্গাপুজো। পুজোর বয়স ৩৫০ বছরেরও বেশি। পরবর্তীতে অন্যতম রাজা শরৎচন্দ্র রায়চৌধুরির নির্দেশে পাকা দুর্গাদালান নির্মিত হয়। ততদিনে জায়গাটির নাম পরিবর্তিত হয়ে পাহাড়পুর হয়ে যায়।

নিত্যপূজারি ভোলানাথ পাণ্ডে জানান, প্রাচীন প্রথা মেনে এখনও সপ্তমী তিথিতে রাজবাড়ি থেকে দুর্গাদালানে নিয়ে আসা হয় অষ্টধাতুর চতুর্ভূজা মা চণ্ডীকে। বর্তমানে চাঁচল রাজ ট্রাস্টি বোর্ড রাজবাড়ির ঠাকুরবাড়ি এবং রাজাদের প্রবর্তিত বিভিন্ন পুজো, স্কুল, মন্দির সংস্কার ইত্যাদি দেখাশোনা করে। ট্রাস্টি বোর্ডের বর্তমান সুপারভাইজার দ্বায়িত্বে রয়েছেন দেবাজয় ভট্টাচার্য। বাজেটে রাজত্বের সমস্ত ব্যয়ের জন্য বছরে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। রাজাদের প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন পুজো, রাজবাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, ঠাকুরবাড়ির নিত্যপুজো।’ ওই বাজেট অনুযায়ী, ২০১৩ সাল থেকে দুর্গাপুজোর জন্য মাত্র নয় হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়। এত কম টাকায় পুজো সম্ভব নয়। গ্রামবাসীরা আমাদের অনুমতি নিয়ে ওই পুজোয় অর্থ সাহায্য করে।

চাঁচল রাজবাড়ির পুজোর বৈশিষ্ট্যগুলি হল, কৃষ্ণা নবমী তিথিতে দুর্গাদালানে কল্পারম্ভ হয়। মল মাসের জন্য একমাস আগেই সেই পুজো শুরু হয়েছে। সপ্তমীর দিন মিছিল সহকারে মা চণ্ডী ঠাকুরবাড়ি থেকে দুর্গাদালানে পুজো নিতে যান। অষ্টমীতে কুমারী পুজো হয়ে আসছে। দশমীর পুজো শেষে পাহাড়পুর থেকে ঠাকুরবাড়ি আসেন। একসময় সতীঘাটায়, মহানন্দার পশ্চিম পাড়ে মহামারী দেখা দিয়েছিল। তখন দেবী সেখানকার মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষকে স্বপ্নাদেশ দিয়েছিলেন, গোধূলিলগ্নে বিসর্জনের সময় তাঁরা যেন মাকে আলো হাতে পথ দেখায়। মাকে আলো দেখানোর পর থেকে মহামারী দূর হয়। সেই রীতি-রেওয়াজ এখনও রয়েছে। তবে লণ্ঠন, মোমবাতির পাশাপাশি মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়েও অনেকে মায়ের যাত্রাপথে আলো দেখায়।

Bangla News Dunia Desk - Pallab

মন্তব্য করুন