ভবিষ্যৎ নিয়ে ‘সিরিয়াস’ হওয়ার জন্য একটা সময়ে মেয়েকে অল্পস্বল্প বকাঝকাও করেছিলেন বাবা ব্রহ্মানন্দ রায়। চাকরি করলে আর্থিক নিরাপত্তা মিলবে, একথা মেয়েকে হাজারবার বুঝিয়েছিলেন। কিন্তু ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করা মেয়ের ততদিনে মন চলে গিয়েছিল সিনেমার দিকে। যা নিয়ে চিন্তিতও ছিল বাঙালি মধ্যবিত্ত রায় পরিবার। কিন্তু সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই সেই চিন্তা বদলে গেল মেয়ের গর্বে। ৮২তম ‘ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভাল’-এ (Venice Film Festival) ‘অরিজন্টি’ বিভাগে সেরা পরিচালকের খেতাব ছিনিয়ে নিয়েছেন বঙ্গতনয়া অনুপর্ণা রায় (Anuparna Roy)। ‘সংগস অফ ফরগটেন ট্রিজ’ (Songs of Forgotten Trees) ছবির জন্য এই পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। আর এই খেতাব জয়ের পর রাত সাড়ে ১২টায় বাবাকে ফোন করে অনুপর্ণা বলেছিলেন, ‘বাবা পুরস্কার পেয়েছি, শুনছো…’। আর মেয়ের কথা শুনে বাবার মাথায় একটা কথাই এসেছিল, ‘জেদি মেয়েটা সত্যি এটা করে দেখাল!’
মেয়ের সাফল্যে আপাতত খুশিতে ভাসছেন রায় দম্পতি। পুরুলিয়া (Purulia) জেলার নিতুড়িয়া ব্লকের নারায়ণপুর গ্রামের বাসিন্দা অনুপর্ণার পরিবার। নিতুড়িয়ায় রানিপুর কোলিয়ারি হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন অনুপর্ণা। তবে তাঁর বাবা ব্রহ্মানন্দ রায় কয়লাখনিতে চাকরি করতেন। সেই সূত্রেই মাধ্যমিকের পরে দুর্গাপুরে (Durgapur) চলে যান তিনি। এরপর কুলটি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক হন। পরবর্তীতে মাস কমিউনিকেশন নিয়ে পড়াশোনার জন্য পাড়ি দিয়েছিলেন দিল্লিতে। পড়াশোনা শেষ করে কিছুদিন আইটি সেক্টরে কাজ করলেও সেই বাঁধাধরা জীবন আটকে রাখতে পারেনি শিল্পী অনুপর্ণাকে। তাই স্বপ্নকে বাস্তব করতে তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন বাণিজ্য নগরী মুম্বইয়ে।
এদিকে, মেয়েকে নিয়ে চিন্তাও বেড়ে গিয়েছিল ব্রহ্মানন্দ রায়ের। কিন্তু সেই উদ্বেগে প্রলেপ লাগিয়েছে মেয়ের প্রতিভা। ‘ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভাল’-এ মেয়ের সেরা পরিচালকের খেতাব জয়ের পর তিনি বলেন, ‘মেয়ে ছোটবেলায় পড়াশোনায় ভালো ছিল। আমি চেয়েছিলাম ওঁ চাকরি করে নিজের পায়ে দাঁড়াক। কিন্তু ওঁ চলে যায় সিনেমাজগতে।’ আর সেই মেয়ের সাফল্যের গর্ব এখন বাবার চোখেমুখে। তবে এখনই মেয়ের সঙ্গে দেখা হবে না তাঁর। কারণ আগামী অক্টোবর মাসে ‘লন্ডন ফিল্ম ফেস্টিভাল’-এ অংশ নেওয়ার কথা অনুপর্ণার। তবে দুর্গাপুজোর মুখে মেয়ে বাড়িতে না ফিরলেও তাঁর সাফল্যে খুশি মা মণীষা রায়। তিনি বলেন, ‘কেমন যে লাগছে, তা ভাষায় বোঝাতে পারব না।’
অনুপর্ণার জ্যেঠিমা বেবি রায় বলেন, ‘ওঁ আমাদের কাছে মানুষ। ছোট সেই মেয়েটা এখন এত বড়বড় পুরস্কার পাচ্ছে, ভেবেই আনন্দ হচ্ছে।’ রানিপুর কোলিয়ারি হাইস্কুলের শিক্ষক সুজিতকুমার পালও প্রাক্তন ছাত্রীর সাফল্যে খুশি। তিনি বলেন, ‘অনুপর্ণার সঙ্গে দেখা করার জন্য মুখিয়ে রয়েছি আমরা সবাই।’ ‘ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভাল’-এ পুরস্কার জয়ের পর পরিচালক অনুপর্ণাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও।














