রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা নিয়ে বিভ্রান্তিও বেড়েছে। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। পাশাপাশি আরও ৬০ লক্ষের বেশি ভোটারের নাম ‘বিচারাধীন’ (Under Adjudication) অবস্থায় রয়েছে।
এই বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়া ও ঝুলে থাকার ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে বিভিন্ন মহলে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এটি নিছক প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা ‘সফটওয়্যার গ্লিচ’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং গোটা প্রক্রিয়াটি প্রশ্নয়ীত করতে নির্বাচন কমিশন এমন তালিকা প্রকাশ করেছে।
ভালো করে যাচাই–বাছাই না করে এই ভোট মুখী রাজ্যে মানুষকে বিপদে ফেলে দিয়ে কমিশন তালিকা কেন প্রকাশ করা হলো তা নিয়েও প্রশ্ন?
ডিজিটাল ইন্ডিয়ার বুলি আওড়াতে আওড়াতে প্রধানমন্ত্রী মোদি এআই সামিটের আয়োজন করল, সেখানে আজ ভোটার তালিকার এই হযবরল অবস্থা কেন? এসআইআর (SIR) বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন প্রক্রিয়ার নামে ঠিক কী ঘটেছে, তার কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা এখনও মেলেনি সাধারন মানুষের কাছে। যে মানুষটি দশকের পর দশক ভোট দিয়ে আসছেন, আজ তিনি হঠাৎ ভোটার তালিকা থেকে ‘বাদ’ হয়ে যাবেন এটি কেবল বিস্ময়কর নয়, বরং উদ্বেগজনক। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে ‘নথি যাচাইয়ের’ কথা বলা হচ্ছে, সেই প্রক্রিয়ার জটিলতায় সাধারণ মানুষ দিশেহারায় পড়েছিল। একজন নাগরিককে ভোটাধিকার প্রমাণের জন্য দিনের পর দিন সরকারি অফিসের বারান্দায় চক্কর কাটাতে বাধ্য করা কি সুস্থ প্রশাসনের পরিচয়?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ। একই নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও একটি সম্প্রদায়ের মানুষের নাম চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেলেও, অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের নামের পাশে ‘বিচারাধীন’ তকমা সেঁটে দেওয়া হচ্ছে। কারা এই সুপারিশ করল, কীভাবে করল তাঁরও ব্যাখ্যা করেনি কমিশন।
যদিও এর আগে হেয়ারিং সম্পন্ন না হলে ১৪ তারিখের চুড়ান্ত ভোটার তালিকা স্থগিত করে ২৮ তারিখ করানো হয়। সেই অবস্থায় পুরোপুরি নথি যাচাই বাছাই না করে কিভাবে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করে সাধারণত মানুষের নামের পাশে বিচারাধীন ট্যাগ লাগিয়ে কমিশন সাধারণ মানুষকে বিপদে মুখে ফেলছে।
পাশাপাশি এই ইস্যুতে রাজনৈতিক দলের সাধারণ মানুষের পাশে থাকার মহুর্তে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান একেবারেই সুবিধাভোগিদের মতো, শাসক দল একে বিজেপি ও কমিশনের ‘ষড়যন্ত্র’ বলছে, আর বিরোধী দল একে ‘কমিশনের স্বচ্ছতা’ বলে নিজেরা নিজেদের দায় সারছে। অথচ কেউই এই লক্ষ লক্ষ বাদ পড়া বা অনিশ্চয়তায় থাকা মানুষের অধিকার নিয়ে কোনো দায়বদ্ধতা দেখাচ্ছে না। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এই মানুষগুলো কেবল ‘ভোটব্যাংক’ বা ‘পরিসংখ্যান’, কিন্তু একজন সাধারণ ভোটারের কাছে তার ভোটাধিকারই তার অস্তিত্বের প্রমাণ; যা আজ প্রমাণ করতে হিমশিম খাচ্ছে।
কমিশন বলেছেন, বিচারাধীন ভোটারদের দ্রুত যাচাই বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সাপ্লিমেন্টারি ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে। সামনের দিনগুলিতে সাপ্লিমেন্টারি ভোটার তালিকা বা নতুন করে আবেদনের ভিত্তিতে কতজন ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার ফিরে পান, এখন সেটাই দেখার বিষয়।














