চিনকে চাপে রাখতে নতুন কৌশল দিল্লির ! জেনে নিন

By Bangla News Dunia Desk Bappaditya

Published on:

 

Bangla News Dunia, বাপ্পাদিত্য:- প্রধানমন্ত্রীর ঘানা সফরের লক্ষ্য আফ্রিকার দেশগুলির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দৃঢ় করা ৷ পশ্চিম আফ্রিকা এবং আফ্রিকান ইউনিয়নের সঙ্গে আর্থিক এবং সামরিক সমঝোতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই সফরের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে ৷ ঘানা পশ্চিম আফ্রিকায় ভারতের অন্যতম বাণিজ্য-সহযোগী দেশ ৷ এই দেশটির সঙ্গে ভারতের নৌ-বাহিনী যৌথ মহড়াও করে থাকে ৷ ঘানার সেনাবাহিনীর জওয়ানদের মধ্যে কেউ কেউ ভারতের বিভিন্ন সামরিক প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণও নিয়ে থাকেন ৷ ভারতে তৈরি অস্ত্র কেনার ক্ষেত্রেও আগ্রহ দেখিয়েছে ঘানা ৷

বিক্রস সম্মেলন থেকে ফেরার পথে এই সফরে নামিবিয়াও গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ৷ সামরিক সমঝোতার দিক থেকে নামিবিয়া ভারতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে থাকে ৷ 1996 সাল থেকে এই দেশটি সেনাবাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণের কাজ করে ভারতীয় সেনা ৷ 2023 সালে ভারতে জি20 সম্মেলন হয় ৷ আফ্রিকান ইউনিয়ন যাতে এই গোষ্ঠীর অংশ হতে পারে তা নিশ্চিত করতে ভারতের বড় ভূমিকা ছিল ৷

ভারত আর চিন গ্লোবাল সাউথের মূল স্তম্ভ হতে চাইছে ৷ সেখানে আফ্রিকা মহাদেশের সমস্ত দেশকেও তারা অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে ৷ গত কয়েক বছরে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ এক বিশেষ রণকৌশল নিয়েছে ৷ তা হল, তাদের দেশে থাকা আমেরিকা এবং ফ্রান্সের মতো পাশ্চাত্য বিশ্বের সশস্ত্র বাহিনীকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া ৷ মালি থেকে শুরু করে বুরকিনা ফাসো, নিগার, চাদ, সেনেগাল এবং আইভরি কোস্ট এই পথে হেঁটেছে ৷

India Africa military ties

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মোদি (ছবি: এএনআই)

এই ফাঁক পূরণের চেষ্টা করেছে রাশিয়া এবং চিনও ৷ তবে এখানে কয়েকটি বিষয় মনে রাখতে হবে ৷ প্রথমত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছে ভারত ৷ তাছাড়া রাশিয়ার বেসরকারি অস্ত্র প্রস্তুতকারী সংস্থা ওয়েঙ্গার গোষ্ঠীর অস্তিত্ব আগের মতো প্রবল না হওয়ায় ভারতের সুযোগ এখন অনেকটা বেড়েছে ৷ ভারত অবশ্য আফ্রিকায় নিজেদের বেস তৈরি করতে চাইছে না ৷ দিল্লি চায় তাদের অংশীদার দেশকে প্রশিক্ষিত করতে ৷ যাতে তারা নিজেরাই নিজেদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারে ৷

কূটনীতি আর ব্যবসা সবসময় মূল আলোচ্য বিষয় হলেও আফ্রিকায় ভারতীয় সামরিক শক্তির অস্তিত্ব যাতে মুছে না যায় তা সকলকে মাথায় রাখতে হবে ৷ 1960 সাল থেকে আফ্রিকায় শান্তি স্থাপনের নানা প্রক্রিয়ার সঙ্গে ভারত জড়িত ৷ শুরুটা অবশ্য হয়েছিল কঙ্গোকে দিয়ে ৷ তালিকায় মোজামবিক থেকে শুরু করে সোমালিয়া, রাওয়াদা, অ্যাঙ্গোলা, সিরিয়া, ইথোপিয়া, সুদান এবং আইভরি কোস্ট-সহ আরও কয়েকটি দেশ আছে ৷ এখনও দক্ষিণ সুদান,আবিয়েই, কঙ্গো এবং সোমালিয়ার মতো দেশে প্রায় 4500 জন ভারতীয় সামরিক বাহিনীর জওয়ান এবং আধিকারিক শান্তি স্থাপনের কাজ করছে ৷ ভূখণ্ডের বিচারে মধ্য আফ্রিকা থেকে পশ্চিম সাহারার মধ্য়ে এই দেশগুলির অবস্থান ৷

চিন শান্তি বাহিনী পাঠাতে শুরু করে 2011 সালে ৷ 2015 সালে দক্ষিণ সুদান এই বাহিনীর জওয়ানদের সাহায্য করতে অস্বীকার করে ৷ সে দেশের বিদ্রোহী শক্তি এই জওয়ানদের আক্রমণ করে ৷ ধর্ষণের মতো ঘটনাও ঘটে ৷ গুলির মুখে চিনের জওয়ানরা পিছু হটেন ৷ তাঁদের দায়িত্বে থাকা দুটি পোস্ট খালি রেখে সঙ্গে থাকা অস্ত্র ফেলে পালিয়ে যায় ৷ এই ঘটনার চিনের ভাবমূর্তি ধাক্কা খায় ৷ ভারতের তরফে সেখানে কুমায়ন রেজিমেন্টের সপ্তম ব্যাটেলিয়ানের জওয়ানরা হাজির ছিলেন ৷ তাঁরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন ৷

ভারত প্রতিবছর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সাড়ে চারশো সেনা জওয়ানকে প্রশিক্ষণ দেয় ৷ নামিবিয়া, তানজানিয়া, বৎসওয়ানা, উঙ্গান্ডা এবং লেসটুতে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য দল তৈরি করেছে ভারত ৷ ইথোপিয়ায় মিলিটারি অ্যাকাডেমি তৈরি করেছে ৷ নাইজেরিয়াতেও ডিফেন্স অ্যাকাডেমি আছে ভারতের ৷ তানজানিয়ায় কমান্ড এবং স্টাফ কলেজও আছে ৷

ভারত অনেকদিন ধরেই আফ্রিকার সঙ্গে যৌথ মহড়া করে আসছে ৷ 2019 সালে প্রথম এই ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হয় ৷ 17টি দেশ সেখানে অংশ নিয়েছিল ৷ 2023 সালে আবারও এই ধরনের মহড়ার আয়োজন হয় ৷ সেখানে অংশ নিয়েছিল আফ্রিকার 25টি দেশ ৷ অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা বাড়া মানে ভারতের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা বৃদ্ধি পাওয়া ৷

India Africa military ties

আফ্রিকার কয়েকটি দেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তার প্রশ্নে ভারতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ (ছবি: ভারতের নৌসেনা)

আলাদা করে আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের কয়েকটি দেশের সঙ্গে সামরিক মহড়া করে ভারতের নৌ-বাহিনী ৷ তারাও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে ৷ 2022 সালের অক্টোবর মাসে ইন্ডিয়া-মোজামবিক-তানজানিয়া একত্রে সামরিক মহড়া করেছিল ৷ ভারতের নৌ-বাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল দীনেশকুমার ত্রিপাঠী নিজে সেখানে হাজির ছিলেন ৷ কেনিয়া, মরিশাস, মোজামবিক এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশ এই মহড়ার অংশ নিয়েছিল ৷

ভারত এবং আফ্রিকার মধ্যে সামরিক সমঝোতা নিয়ে মতের আদানপ্রদানও হয়েছে ৷ এই সংক্রান্ত একটি ফোরাম তৈরি হয় 2022 সালে ৷ সে বছর লখনউতে সংগঠনটির প্রথম বৈঠক হয় ৷ সেই উপলক্ষ্য ডিফেন্স এক্সপোরও আয়োজন করা হয়েছিল ৷ গুজরাতেও এই ধরনের এক্সপোর আয়োজন করা হয়েছিল ৷ এ বছর এক্সোপর আসর বসে বেঙ্গালুরুতে ৷ তাতে মোট 50টি দেশের প্রতিনিধির অংশ নিয়েছিলেন ৷ আফ্রিকার অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে সামরিক বাহিনীর প্রধানরাও হাজির ছিলেন ৷

ভারত এবং আফ্রিকার দেশগুলির সেনাপ্রধানদের নিয়ে কনক্লেভেরও আয়োজন হয়ে থাকে ৷ এখনও পর্যন্ত শেষ বৈঠকটি হয়েছিল 2023 সালে পুনায় ৷ অনুষ্ঠানের পোশাকি নাম দেওয়া হয়েছিল ‘আফ্রিকা-ইন্ডিয়া মিলিটারিস ফর রিজওন্যাল ইউনিটি’৷ ভারত এবং আফ্রিকার মধ্যে সামরিক সমন্বয় বাড়ানোই ছিল এই কনক্লেভের লক্ষ্য ৷ অংশ নিয়েছিল মোট 31টি দেশ ৷

আফ্রিকার পূর্ব উপকূল এবং ভারত মহাসাগরের পশ্চিমে থাকা দেশগুলিকে নিরাপত্তা দেওয়ার কাজ করে আসছে ভারতের নৌ-বাহিনী ৷ মানব ও মাদক পাচার রোখাও ভারতীয় বাহিনীর কাজের মধ্যে পড়ে ৷ 2020 সালে হওয়া জেদাহ সংশোধনের মাধ্যমে জিবুটিতে আচার আচরণের নয়া বিধি তৈরি হয়েছে ৷ এটি তৈরি করার ক্ষেত্রে ভারতের বিরাট অবদান ছিল ৷ পাইরেসি থেকে সশস্ত্র ডাকাতি নিয়ন্ত্রণ করতে সেখানে নতুন বিধানের ব্যবস্থা করা হয়েছে ৷

ভারতীয় নৌ-বাহিনীর এক প্রবীণ আধিকারিক ভারতের অপারেশন সঙ্কল্প নিয়ে কথা বলেছেন ৷ আরব সাগরে ভারতের এই সামরিক অভিযানের লক্ষ্য ওই অঞ্চলে থাকা দেশগুলির নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা ৷ আর তার জেরে 110 জনের জীবন বাঁচানো গিয়েছে ৷ তার মধ্য়ে 45 জন ভারতীয় ৷ সার থেকে শুরু করে অপরিশোধিত তেলের মতো প্রায় 1.5 মিলিয়ন টন সামগ্রী বাজেয়াপ্তও করা হয়েছে ৷ তিন হাজার কিলো মাদকও বাজেয়াপ্ত হয়েছে ৷ 450টি বাণিজ্যিক জাহাজ ভারতের নৌ-বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়েছে ৷ অপারেশন সঙ্কল্প ভারতের সামরিক শক্তির পরিচয় খুব ভালোভাবে দিয়েছে ৷

India Africa military ties

সামুদ্রিক নিরাপত্তায় ভারতের নৌসেনার যুদ্ধজাহাজ (ছবি: ভারতের নৌসেনা)

সামুদ্রিক নিরাপত্তার প্রশ্নে চিনও ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ৷ চিনের সেনাও 2018 সাল থেকে ভারত মহাসাগরের পশ্চিমাংশের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখে ৷ জিবুটিতে তাদের একটি সামরিক ঘাঁটি আছে ৷ মোজামবিকেও ঘাঁটি তৈরির প্রয়াস করছে বেজিং ৷ আফ্রিকার সঙ্গে সামরিক সম্পর্কে গতি আনার কাজ 2018 সালেই শুরু করেছে চিন ৷ সামরিক সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিকতা দেওয়ার চেষ্টাও সেই তখন থেকেই শুরু ৷ আফ্রিকার 52টির মধ্যে 44টি দেশ চিনেক বিআরআই-এর সদস্য ৷ তবে ভারতের সামগ্রিক আচার-আচরণ চিনের থেকে অনেক বেশি প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা রাখে ৷

ঐতিহাসিকভাবেই আফ্রিকার সঙ্গে ভারতের সামরিক যোগাযোগ বা সম্পর্ক আছে ৷ চিন বা অন্য কোনও দেশের পক্ষে এই বাস্তব অস্বীকার করে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া বেশ কঠিন ৷ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ভারতের সামরিক উপস্থিতি চোখে পড়ে ৷ এখানকার বিভিন্ন দেশে রাশিয়া অস্ত্র সরবরাহ করত ৷ চিন এবং ইউরোপের কিছু দেশের সঙ্গেও লেনদেন ছিল ৷ ভারত প্রতিযোগিতার অংশ হওয়ায় এই পরিস্থিতিতে বলার মতো পরিবর্তন এসেছে ৷

ভারতের তৈরি অস্ত্রের গুণমান চিনের থেকে ভালো ৷ শুধু তাই নয়, বিক্রির পরও নানা ধরনের পরিষেবা দেওয়ার ব্য়াপারেও ভারত চিনের থেকে এগিয়ে ৷ অস্ত্র বিক্রির ব্যাপারে আফ্রিকার দেশগুলিকে নানা রকমের বাণিজ্যিক সুবিধা ভারত দিয়ে থাকে ৷ প্রশিক্ষণের কথা আগেই বলা হয়েছে ৷ খরচের দিক থেকে ভাবলেও ভারতের কাছে আফ্রিকার অস্ত্র বাজারে নিজের জন্য স্বতন্ত্র জায়গা তৈরির অনেক সুযোগ আছে ৷ অপারেশন সিঁদুরের পর ভারতীয় অস্ত্রের প্রযুক্তিগত পারদর্শীতা নিয়েও তুমুল চর্চা হচ্ছে ৷

আফ্রিকার সঙ্গে ভারতের সামরিক সখ্য বৃদ্ধির বেশ কয়েকটি সুবিধে আছে ৷ আফ্রিকায় প্রচুর পরিমাণে ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাগরিক থাকেন ৷ তাছাড়া প্রাকৃতিক বা অন্য কোনও বিপর্যয়ের সময়ে নাগরিকদের উদ্ধারের ক্ষেত্রেও এই সামরিক সখ্যর বিশেষ ভূমিকা আছে ৷ আরও একটা ব্যাপার মনে রাখতে হবে আফ্রিকার বেশিরভাগ দেশে সামরিক শাসন কায়েম আছে ৷ নইলে এমন সরকার ক্ষমতায় আছে যাদের সংশ্লিষ্ট দেশের সামরিক শক্তি সাহায্য করে ৷ সেটাও অস্ত্র বাজারে ভারতের উপস্থিতি বৃদ্ধি করবে ৷ সবচেয়ে বড় কথা চিনকে এই মহাদেশে দাপট বিস্তার থেকে দূরে রাখা সম্ভব হবে ৷

আরও পড়ুন:- পুজো কমিটিগুলোর জন্য ইলেকট্রিক বিলে কত টাকা ছাড় দিলেন মুখ্যমন্ত্রী ? জেনে নিন

আরও পড়ুন:- বাংলায় ৭১ টি মেডিক্যাল কলেজকে নোটিশ ধরাল কেন্দ্র, কারণ কি ? জেনে নিন

Bangla News Dunia Desk Bappaditya

মন্তব্য করুন