রাজ্য সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সহায়তা প্রকল্প ‘তরুণের স্বপ্ন’ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অপেক্ষায় ছিলেন একাদশ শ্রেণির পড়ুয়ারা। অবশেষে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে। সেপ্টেম্বর মাসে ট্যাব কেনার জন্য আর্থিক সাহায্য পাওয়ার কথা থাকলেও বছরের শেষ পর্যন্ত সেই টাকা হাতে পাননি বহু পড়ুয়া। এর ফলে চিন্তিত ছিলেন প্রচুর শিক্ষার্থী। ফলে পড়ুয়াদের পাশাপাশি অভিভাবকদের মধ্যেও তৈরি হয়েছিল অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান হতে চলেছে। শিক্ষা দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, চলতি সপ্তাহ থেকেই ‘তরুণের স্বপ্ন’ প্রকল্পের টাকা ধাপে ধাপে পড়ুয়াদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়তে শুরু করবে। সরাসরি ব্যাংক একাউন্টে এই টাকা জমা করবে।

প্রতি পড়ুয়াকে ১০ হাজার টাকা, উপকৃত হবে প্রায় ৬ লক্ষ ছাত্রছাত্রী
শিক্ষা দফতরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ বছর প্রায় ৬ লক্ষ একাদশ শ্রেণির পড়ুয়া এই প্রকল্পের আওতায় সুবিধা পেতে চলেছে। স্কুল ছুট কমাতে এবং ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনার জন্য আগ্রহী করে তুলতে প্রত্যেক পড়ুয়ার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি ১০,০০০ টাকা করে পাঠানো হবে, যা মূলত ট্যাব, স্মার্ট ডিভাইস বা অনলাইন পড়াশোনার সরঞ্জাম কেনার জন্য নির্ধারিত। মূলত ছাত্র ছাত্রীরা এই ডিজিটাল যুগে যাতে তাদেরকে আপডেট করতে পারে এবং পড়াশোনাকে ডিজিটালাইজ করতে পারে তার জন্যই রাজ্য সরকারের এই বড় উদ্যোগ।
সরকারি সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, এবার কোনও মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই Direct Benefit Transfer (DBT) পদ্ধতিতে টাকা পৌঁছে দেওয়া হবে, যাতে আগের বছরের মতো কোনও অনিয়ম বা বিভ্রান্তির সুযোগ না থাকে। এর আগের বছর প্রচুর বিভ্রান্তি হয়েছে এবং ট্যাব কেলেঙ্কারিতে প্রচুর দুষ্কৃতীরা জেলে গিয়েছে। এবার সেটা কেলেঙ্কারি হবে না বলে জানিয়েছে রাজ্য সরকার কারণ অনেক সিকিউরিটি এবং ছাত্র-ছাত্রীদের তথ্য ম্যাচ করে তারপরে টাকা দেওয়া হবে।
কেন এত দেরি হল টাকা দিতে?
প্রশ্ন উঠছে, সেপ্টেম্বর মাসে টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও কেন এতদিন বিলম্ব হল?
এই প্রসঙ্গে একাধিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং শিক্ষা দফতরের আধিকারিকরা জানিয়েছেন, গত বছরের অভিজ্ঞতা থেকেই এ বছর বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। এর আগের বছর প্রচুর দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়েছে এবং সেগুলো বন্ধ করতে এবার কিছুটা সিকিউরিটি বাড়ানো হয়েছে এবং তথ্যগুলো ভালো করে খাতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গত বছর অভিযোগ উঠেছিল—
- কিছু পড়ুয়ার ট্যাবের টাকা অন্য অ্যাকাউন্টে চলে গিয়েছে এর ফলে অনেক পড়ুয়ার ব্যাংক একাউন্টে টাকা ঢোকেনি
- ভুল ব্যাঙ্ক তথ্যের কারণে টাকা ফেরত এসেছে তাই যাতে এই সমস্যা না হয় সেদিকে দেখা হচ্ছে
- এমনকি কিছু ক্ষেত্রে অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার অভিযোগও সামনে আসে
এই সমস্ত অভিযোগের প্রেক্ষিতে এ বছর সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, যাচাই প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা হবে, যদিও তাতে সময় একটু বেশি লাগবে। তবে সকলেই টাকা পাবে এবং সকলকে নিশ্চিন্তে থাকতে বলা হয়েছে এবং চলতি সপ্তাহে বা চলতি মাসেই এই টাকা ব্যাংক একাউন্টে সরাসরি চলে আসবে।
নতুন পদ্ধতিতে কী কী পরিবর্তন আনা হয়েছে?
এ বছর ‘তরুণের স্বপ্ন’ প্রকল্পে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন করা হয়েছে—
১. পড়ুয়ারা নিজেরাই তথ্য যাচাই করবে
আগে প্রধান শিক্ষকেরা সরাসরি পড়ুয়াদের ব্যাঙ্ক তথ্য পোর্টালে আপলোড করতেন। এবং সমস্ত তথ্য ও ভালোভাবে খাতিয়ে দেখা হবে যদি কোন ভুল তথ্য দেওয়া থাকে তাহলে একাউন্টে টাকা ঢুকবে না। এবার পড়ুয়াদের একটি নির্দিষ্ট লিংক পাঠানো হয়েছে, যেখানে তারা নিজেরাই—
- নামের বানান
- আধার নম্বর
- ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর
- IFSC কোড
খতিয়ে দেখে নিশ্চিত করছে।
২. সেল্ফ ডিক্লারেশন বাধ্যতামূলক
সব তথ্য যাচাইয়ের পর পড়ুয়াদের কাছ থেকে ‘Self Declaration’ নেওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনও ভুলের দায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপর না পড়ে। এবং যদি কোন ভুল তথ্য দেওয়া থাকে তাহলে শিক্ষার্থীর নিজেই সেটি আগে থেকেই সেলফ ডিক্লারেশন দিয়ে স্বীকার করে নেবে।
৩. জেলা পরিদর্শকদের নজরদারি
জেলা স্কুল পরিদর্শকদের তরফে ইতিমধ্যেই প্রধান শিক্ষকদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ভার্চুয়াল বৈঠকও সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে—
“যেসব পড়ুয়ার সমস্ত নথিপত্র সঠিক এবং যাচাই সম্পূর্ণ হয়েছে, কেবল তাদেরই টাকা পাঠানো হবে।” যদি কারো নথি ভুল থাকে এবং কোন তথ্য মিস ম্যাচ দেখায় তাহলে তার একাউন্টে টাকা পাঠানো হবে না।
নথির গরমিলেই আটকে রয়েছে টাকা
শিক্ষা দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, এখনও বহু পড়ুয়ার ক্ষেত্রে—
- নামের বানান আধার ও ব্যাঙ্ক নথির সঙ্গে মিলছে না
- ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট রাজ্যের বাইরে খোলা
- যৌথ অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত সমস্যা
এই কারণেই কিছু পড়ুয়ার টাকা এখনও আটকে রয়েছে। দফতর থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব এই গরমিল সংশোধন করতে হবে, নইলে পরবর্তী কিস্তিতে টাকা পেতে দেরি হতে পারে।
রাজ্যের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বাধ্যতামূলক
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—
এই প্রকল্পের আওতায় টাকা পেতে হলে পড়ুয়ার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের কোনও ব্যাঙ্ক শাখায় খোলা থাকতে হবে। অন্য রাজ্যের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকলে আপাতত সেই অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হবে না।
চলতি সপ্তাহেই শুরু হবে টাকা ঢোকা
সবচেয়ে বড় আপডেট হল—
চলতি সপ্তাহ থেকেই ‘তরুণের স্বপ্ন’ প্রকল্পের টাকা পড়ুয়াদের অ্যাকাউন্টে ঢোকা শুরু করবে।
প্রথম ধাপে যেসব পড়ুয়ার নথি ১০০% সঠিক এবং যাচাই সম্পন্ন হয়েছে, তাদের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হবে। এরপর ধাপে ধাপে বাকি পড়ুয়ারাও টাকা পাবেন।
অভিভাবকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
শিক্ষা দফতর ও স্কুল কর্তৃপক্ষের তরফে অভিভাবকদের উদ্দেশে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেওয়া হয়েছে—
- ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে নামের বানান ঠিক আছে কি না যাচাই করুন
- আধার ও ব্যাঙ্ক তথ্য মিলছে কি না দেখুন
- স্কুল থেকে পাঠানো লিংক অবহেলা করবেন না
- প্রয়োজনে দ্রুত স্কুলে যোগাযোগ করুন
‘তরুণের স্বপ্ন’ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য
রাজ্য সরকারের এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য—
- ডিজিটাল শিক্ষাকে আরও সহজ করা
- অনলাইন ক্লাস ও পড়াশোনার সুযোগ বাড়ানো
- আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া ছাত্রছাত্রীদের পাশে দাঁড়ানো
সরকারের মতে, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির পড়াশোনায় প্রযুক্তির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আর সেই কারণেই এই প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
দীর্ঘ অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা এবং উদ্বেগের পর অবশেষে স্বস্তির খবর পেল একাদশ শ্রেণির পড়ুয়ারা। যদিও যাচাই প্রক্রিয়ার কারণে কিছুটা দেরি হয়েছে, তবে সরকার ও শিক্ষা দফতরের দাবি—
এই বিলম্ব নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার স্বার্থেই।
সব কিছু ঠিক থাকলে, নতুন বছরের শুরুতেই পড়ুয়াদের হাতে পৌঁছে যাবে ‘তরুণের স্বপ্ন’ প্রকল্পের ১০ হাজার টাকা, যা তাদের পড়াশোনার পথে এক বড় সহায়ক হবে বলেই মনে করছেন শিক্ষা মহল।














