আমাদের দেশে নারীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ জরায়ুমুখের ক্যান্সার। স্তন ক্যান্সারের পরেই এটি দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৮০,০০০ নতুন রোগী শনাক্ত হয় এবং ৪২,০০০-এর বেশি নারীর মৃত্যু হয় এই মরণব্যাধিতে। এছাড়াও প্রতি সাত মিনিটে এক জন করে মহিলা এই মরণ রোগে তার প্রাণ হারান। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে সারভাইকাল ক্যানসার বলে।
তবে ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই জরায়ুমুখের ক্যান্সার হয় ‘হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস’ বা HPV-এর ১৬ এবং ১৮ নম্বর স্ট্রেইনের সংক্রমণের কারণে। এবার এটি প্রতিরোধে মোদি সরকার কিশোরীদের জন্য বিশেষ টিকাকরণ কর্মসূচি চালু করতে চলেছে। সরকার দেশের সমস্ত ১৪ বছর বয়সী কিশোরীকে বিনা মূল্যে এই টিকা দেবে। ভ্যাকসিন গুলো বেসরকারি কোম্পানি থেকে নিতে গেলে এক একটি ডোজের দাম চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত পড়ে যাবে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
HPV সংক্রমণ রুখতে ‘গার্ডাসিল-৯’ (Gardasil-9) নামক টিকা ব্যবহার করা হবে, যা HPV-এর ৬, ১১, ১৬ এবং ১৮ নম্বর স্ট্রেইনের বিরুদ্ধে কাজ করে। ২০০৬ সাল থেকেই এই টিকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের FDA অনুমোদিত এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর স্বীকৃতিপ্রাপ্ত।
এছাড়াও গবেষণায় দেখা গেছে, এই টিকা অত্যন্ত নিরাপদ। এর ফলে বন্ধ্যাত্ব, অটোইমিউন ডিজিজ বা অন্য কোনো ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার কোনো প্রমাণ বিশ্বজুড়ে পাওয়া যায়নি। ইনজেকশনের জায়গায় সামান্য ব্যথা বা অস্বস্তি ছাড়া বড় কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সাধারণত দেখা যায় না।
আজ ২৮শে ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে আজমীর থেকে সারা দেশে চালু করা হচ্ছে এই কর্মসূচি। এই মহতি উদ্যোগে এইমস কল্যাণী (AIIMS Kalyani) ভারত সরকারের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে বলে নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট করেন।
এই ভ্যাকসিন পাবে মূলত ১৪ বছর বয়সী কিশোরীরা। এছাড়া এই ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে সরকারি মেডিকেল কলেজ, জেলা হাসপাতাল, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং আয়ুষ্মান আরোগ্য কেন্দ্রে এই টিকা বিনামূল্যে পাওয়া যাবে। যদিও এই ভ্যাকসিন বাধ্যতামূলক নয়। নিজের এবং সন্তানের সুরক্ষার জন্য অভিভাবকরা স্বেচ্ছায় এই টিকা নিতে পারবেন, তবে এর জন্য অভিভাবকের সম্মতি আবশ্যক।
কোভিডের সময়ের মতো, এই টিকাকরণ কর্মসূচিটি সরকারি U-WIN বা uwin.gov.in পোর্টালের মাধ্যমে চলবে। এখানে ডিজিটাল স্লট বুকিং এবং কোভিড সার্টিফিকেটের মতো সার্টিফিকেট এর ব্যবস্থা থাকবে।
আমাদের দেশে এই রোগের স্ক্রিনিং বা পরীক্ষার হার ৫ শতাংশেরও কম, যেখানে বিশ্বজুড়ে ১৬০টিরও বেশি দেশ ইতিমধ্যে HPV টিকা প্রদানের মাধ্যমে এই রোগ মোকাবিলায় সফলভাবে এগিয়ে গেছে।
প্রখ্যাত ভাইরোলজিস্ট এবং নোবেল বিজয়ী হ্যারাল্ড জুর হাউসেন (Harald zur Hausen) প্রথম আবিষ্কার করেন যে, কীভাবে নির্দিষ্ট কিছু ভাইরাসের সংক্রমণ জরায়ুমুখের ক্যান্সারের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর এই যুগান্তকারী গবেষণাই HPV ভ্যাকসিনের পথ প্রশস্ত করেছে, যা আজ জরায়ুমুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিচ্ছে।
প্রতিবেদনে: আনিসা জেবা














