উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সূচিত হল। আজ, ৬ এপ্রিল ২০২৬, নাসার আর্টেমিস-২ (Artemis-II) মহাকাশযানটি চাঁদের মহাকর্ষীয় প্রভাব বলয়ে (Gravitational Sphere of Influence) প্রবেশ করেছে। এই মিশনের মাধ্যমে চার মহাকাশচারী ভেঙে দিয়েছেন ১৯৭০ সালে অ্যাপোলো-১৩-এর গড়া দীর্ঘদিনের রেকর্ড।
পৃথিবী থেকে প্রায় ৪,০৬,৭৭৩ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে আর্টেমিস-২ এখন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে দূরপাল্লার মহাকাশ অভিযানের শিরোপা দখল করেছে। এটি অ্যাপোলো-১৩-এর রেকর্ডের চেয়ে প্রায় ২,৫০০ কিলোমিটার বেশি। যেখানে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (ISS) পৃথিবী থেকে মাত্র ৪০০ কিলোমিটার উপরে অবস্থান করে, সেখানে আর্টেমিস-২ এর এই যাত্রা এক অবিশ্বাস্য উল্লম্ফন।
আর্টেমিস-২ মিশনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর মুহূর্তটি আসতে চলেছে ৭ এপ্রিল, ২০২৬, ভারতীয় সময় রাত ১২:১৫ মিনিটে। এই সময়ে মহাকাশযানটি চাঁদের ‘লুনার ফ্লাইবাই’ (lunar flyby) শুরু করবে। মহাকাশচারীরা চাঁদের অন্ধকার দিক (Far side) প্রদক্ষিণ করে পুনরায় পৃথিবীর পথে যাত্রা করবেন।
আর্টেমিস-২ মিশনটি ‘ফ্রি-রিটার্ন ট্র্যাজেক্টোরি’ (Free-return trajectory) অনুসরণ করছে। এটি অরবিটাল মেকানিক্সের এক চমৎকার প্রয়োগ।
- কাজ করার পদ্ধতি: এই পদ্ধতিতে মহাকাশযানটি চাঁদের নিজস্ব মহাকর্ষ শক্তিকে ব্যবহার করে ‘স্লিং শট’-এর মতো নিজেকে পৃথিবীর দিকে ঠেলে দেবে।
- কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ? যদি কোনো কারণে মহাকাশযানের প্রধান ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়, তবুও চাঁদের টানে মহাকাশচারীরা নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারবেন। এটি মূলত একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
পৃথিবীর চৌম্বকীয় ক্ষেত্র আমাদের ক্ষতিকর মহাজাগতিক বিকিরণ থেকে রক্ষা করে। কিন্তু ২,০০০ কিলোমিটার উচ্চতা ছাড়িয়ে যাওয়ার পর মহাকাশচারীরা সেই সুরক্ষা হারান। আর্টেমিস-২-এর ক্রুরা অ্যাপোলো যুগের পর প্রথমবার সরাসরি কসমিক রেডিয়েশন বা মহাজাগতিক বিকিরণের সম্মুখীন হচ্ছেন। এই পরিবেশে মানুষের শরীরের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা এই মিশনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য, যা ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত সহায়ক হবে। উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার ভোরে চার মহাকাশচারী- কমান্ডার রিড ওয়াইসম্যান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার, অভিযান বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিনা কচ ও জেরেমি হানসেনকে চাঁদের উদ্দেশে পাড়ি দিয়েছিল নাসার ওরিয়ন মহাকাশযান।
মিশন শেষে যখন ওরিয়ন (Orion) ক্যাপসুলটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে, তখন এর গতি থাকবে ঘণ্টায় প্রায় ৪০,২০০ কিলোমিটার—যা যেকোনো মানববাহী মহাকাশযানের ক্ষেত্রে দ্রুততম। বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে এই তীব্র সংঘর্ষে ওরিয়নের হিট শিল্ড বা তাপবর্মকে প্রায় ২,৭৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সহ্য করতে হবে, যা সূর্যের উপরিভাগের তাপমাত্রার প্রায় অর্ধেক।
নাসার মতে, চাঁদ কোনো গন্তব্য নয়, বরং এটি একটি মহড়া। আর্টেমিস-২ থেকে প্রাপ্ত প্রতিটি তথ্য, রেডিয়েশন ডেটা এবং মানবদেহের শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তনগুলো সরাসরি কাজে লাগানো হবে মঙ্গল অভিযানের প্রস্তুতিতে। গত পাঁচ দশকের মধ্যে মানবজাতির জন্য এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ অভিযান।














