Q-MITRA App: ভারতীয় রেলে তৎকাল টিকিট কাটা মানেই এক প্রকার যুদ্ধের সামিল। টিকিট কাউন্টার খোলার বহু আগে থেকেই লম্বা লাইন, আর সেই লাইনে দালালদের দৌরাত্ম্য— এই ছবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু এবার সাধারণ যাত্রীদের স্বস্তি দিতে রেলে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে চলেছে। রেল মন্ত্রক এমন এক প্রযুক্তি আনতে চলেছে, যা যাত্রীদের লাইনে দাঁড়ানোর কষ্ট কমাবে এবং দালাল চক্রের কোমর ভেঙে দেবে। এই নতুন ব্যবস্থার নাম দেওয়া হয়েছে ‘Q-MITRA’ (কিউ-মিত্রা)।
চিরাচরিত লাইনের দিন শেষ?
এতদিন তৎকাল টিকিট কাটতে হলে যাত্রীদের আগের দিন রাত থেকে বা ভোরবেলা থেকে কাউন্টারের সামনে লাইন দিতে হতো। এতেও নিশ্চিত হওয়া যেত না যে টিকিট মিলবে কি না। কিন্তু নতুন এই ‘কিউ-মিত্রা’ প্রযুক্তির মাধ্যমে রেলওয়ে ফিজিক্যাল বা শারীরিক লাইনের ধারণাটাই বদলে দিতে চাইছে। এখন থেকে যাত্রীদের সশরীরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার বদলে ডিজিটাল টোকেন সংগ্রহ করতে হবে। এটি মূলত একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ভিত্তিক ব্যবস্থা, যা কাউন্টার বুকিংকে আরও স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করে তুলবে।
বর্তমানে এই প্রযুক্তিটি একটি ‘পাইলট প্রজেক্ট’ হিসেবে বিহারের বেগুসরাই স্টেশনে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে। সেখানে সফলতা মিললে সারা ভারতের সমস্ত বড় স্টেশনে এই নিয়ম কার্যকর করা হবে।
ডিজিটাল টোকেন ব্যবস্থা: কীভাবে কাজ করবে?
নতুন এই পদ্ধতিতে যাত্রীদের স্টেশনে যেতে হবে ঠিকই, কিন্তু লাইনে দাঁড়াতে হবে না। প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে সম্পন্ন হবে:
- রেজিস্ট্রেশন ও ভেরিফিকেশন: যাত্রীকে স্টেশনে গিয়ে কিউ-মিত্রা অ্যাপে নিজের নাম নথিভুক্ত করতে হবে। এর জন্য মোবাইল নম্বর এবং সরকারি সচিত্র পরিচয়পত্র (যেমন আধার বা ভোটার কার্ড) বাধ্যতামূলক।
- ফেস ভেরিফিকেশন: দালাল রুখতে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতে চলেছে এটি। অ্যাপের মাধ্যমে যাত্রীর লাইভ ছবি তোলা হবে এবং তা ভেরিফাই করা হবে।
- টোকেন জেনারেশন: রেজিস্ট্রেশন সফল হলে একটি ডিজিটাল টোকেন জেনারেট হবে। এই প্রক্রিয়া শুরু হবে টিকিট বুকিংয়ের আগের দিন রাত ১২টা থেকে। অর্থাৎ, কেউ যদি ৪ তারিখে যাত্রা করতে চান, তবে ৩ তারিখে বুকিং হবে এবং ২ তারিখ রাত ১২টার পর থেকেই টোকেন নেওয়া যাবে।
- কাউন্টারে উপস্থিতি: পরদিন সকালে এসি ক্লাসের জন্য সকাল ১০টায় এবং নন-এসির জন্য সকাল ১১টায় কাউন্টারে গিয়ে সেই টোকেন নম্বর অনুযায়ী টিকিট কাটতে হবে।
দালালদের দাপট কমাতে কড়া নজরদারি
রেলওয়ের এই নতুন উদ্যোগে দালাল বা এজেন্টদের অবৈধ কারবার বন্ধ করতে একাধিক কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। প্রযুক্তিকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে একজন ব্যক্তি চাইলেই একাধিক টিকিট ব্লক করতে না পারেন।
১. টোকেনের সীমা: একজন ব্যক্তি দিনে মাত্র একটিই টোকেন জেনারেট করতে পারবেন।
২. মাসিক নিয়ন্ত্রণ: সারা মাসে একজন ব্যক্তি সর্বাধিক ৫টি টোকেন সংগ্রহ করতে পারবেন।
৩. সন্দেহজনক গতিবিধি ট্র্যাকিং: রেলের সার্ভার যাত্রীদের ডেটা বিশ্লেষণ করবে। যদি দেখা যায় কোনো ব্যক্তি নিয়মিত বিভিন্ন রুটের (যেমন একদিন দিল্লি, অন্যদিন চেন্নাই) টিকিট কাটছেন এবং যাত্রীদের সঙ্গে তার কোনো আত্মীয়তা নেই, তবে তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। এক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।
সাধারণ যাত্রীদের কী সুবিধা হবে?
অনলাইন বুকিংয়ে আইআরসিটিসি আগেই অনেক কড়াকড়ি করেছে, কিন্তু কাউন্টার বুকিংয়ে এতদিন অনেক ফাঁকফোকর ছিল। বায়োমেট্রিক ও ফেস ভেরিফিকেশনের ফলে ভুয়ো লোক বা দালালরা লাইনে দাঁড়াতে পারবে না। ফলে প্রকৃত যাত্রীরা, যারা সত্যিই প্রয়োজনে তৎকাল টিকিট চাইছেন, তাদের টিকিট পাওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যাবে। যদিও রেলের অভ্যন্তরীণ অসাধু কর্মীদের একাংশ এই ব্যবস্থার মধ্যেও দুর্নীতি করতে পারে কি না, তা নিয়ে কিছুটা আশঙ্কা থেকেই যায়, তবে প্রযুক্তির ব্যবহার যে স্বচ্ছতা বাড়াবে তা নিশ্চিত।














