Silver Price Analysis: নতুন বছরের শুরু থেকেই কমোডিটি মার্কেট বা পণ্য বাজারে এক অদ্ভুত অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে সোনা এবং রুপোর (Silver) দামে যে অভূতপূর্ব উত্থান দেখা যাচ্ছে, তা সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে বাজার বিশেষজ্ঞদেরও ভাবিয়ে তুলেছে। গত বছর থেকে সোনার দাম ধারাবাহিক বাড়লেও, সম্প্রতি রুপো যেন সমস্ত রেকর্ড ভাঙার প্রস্তুতি নিয়েছে। নতুন বছরের মাত্র ২০ দিনের মধ্যেই রুপোর দামে প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে, যা সোনার রিটার্নকেও ছাপিয়ে গিয়েছে। কিন্তু এই আকাশছোঁয়া দাম কি দীর্ঘস্থায়ী হবে, নাকি অপেক্ষা করছে বড়সড় পতন?
রুপোর এই হঠাৎ উত্থানের কারণ কী?
বাজার বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, রুপোর এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে মূলত পাঁচটি বড় কারণ কাজ করছে:
- ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা: আন্তর্জাতিক স্তরে আমেরিকা এবং চিনের মধ্যে নতুন করে ট্রেড ওয়ার বা বাণিজ্য যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্ক নীতি বা ট্যারিফ এবং অর্থনৈতিক পদক্ষেপের কারণে ডলারের স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এই অনিশ্চয়তার সময়ে সুরক্ষার কথা ভেবে বিশ্বের বিভিন্ন সেন্ট্রাল ব্যাংক ডলার বিক্রি করে সোনা ও রুপোর মজুত বাড়াচ্ছে।
- চিনের কড়া অবস্থান: বিশ্বের সবথেকে বড় সিলভার রিফাইনার হল চিন। তারা বর্তমানে নিজেদের দেশের সোলার প্যানেল এবং ইলেকট্রিক ভেহিকল (EV) শিল্পের চাহিদা মেটাতে এবং ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে রুপো রপ্তানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে।
- ভারতের চাহিদা: ভারত বিশ্ববাজারে রুপোর অন্যতম বৃহত্তম ক্রেতা। গত দিওয়ালিতে ভারতে রুপোর চাহিদা এতটাই বেশি ছিল যে, লন্ডনের ভল্টগুলিতে রুপোর রিজার্ভ বা মজুত ঐতিহাসিক ভাবে কমে গিয়েছে।
- শিল্পক্ষেত্রে অপরিহার্যতা: ইলেকট্রনিক্স থেকে শুরু করে মেডিক্যাল সরঞ্জাম, সোলার প্যানেল এবং ইভি ব্যাটারি—সর্বত্র রুপোর ব্যবহার ব্যাপক। এটি বিদ্যুতের সবথেকে ভালো সুপরিবাহী এবং এর কোনো সস্তা বিকল্প বর্তমানে বাজারে নেই।
- বিনিয়োগের অভিমুখ বদল: শেয়ার বাজারে সাম্প্রতিক পতনের ফলে বিনিয়োগকারীরা এখন স্টকের বদলে কমোডিটির দিকে ঝুঁকছেন। সিলভার ইটিএফ (ETF)-এ বিপুল পরিমাণ অর্থের আগমন বা ইনফ্লো দেখা যাচ্ছে, যা দামকে আরও ঠেলে ওপরে তুলছে।
ইতিহাস কী বলছে: সাবধানের মার নেই
রুপোকে বিনিয়োগের জগতে অনেক সময় “ডেভিলস মেটাল” বা শয়তানের ধাতু বলা হয়। এর কারণ হল, এই ধাতুটির দাম যতটা দ্রুতগতিতে বাড়ে, পড়ার সময় ঠিক ততটাই দ্রুত ধসে পড়ে। অতীত পরিসংখ্যান বা হিস্টোরিক্যাল ডেটা কিন্তু বড়সড় পতনেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নিচে রুপোর ঐতিহাসিক উত্থান ও পতনের একটি তালিকা দেওয়া হলো:
| সময়কাল | সর্বোচ্চ বৃদ্ধি | পরবর্তী পতন |
|---|---|---|
| ১৯৭৯-১৯৮০ | $৬ থেকে $৫০ (৭০০% বৃদ্ধি) | কিছুদিনের মধ্যেই ৯০% কমে $৫-এ পতন |
| ২০০৮-২০১১ | $৯ থেকে $৪৯-এ উত্থান | ২০১৫ সালের মধ্যে ৭০% কমে $১৪-এ পতন |
| ২০২০-২০২১ | কোভিড স্টিমুলাসের কারণে ১৫০% বৃদ্ধি | সুদের হার বাড়তেই ৪০% পতন |
সোনা-রুপোর অনুপাত ও বর্তমান মূল্যায়ন
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ‘গোল্ড-টু-সিলভার রেশিও’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। সহজ কথায়, এক আউন্স সোনা কিনতে কত আউন্স রুপো প্রয়োজন, এটি তারই হিসেব।
বর্তমানে এই রেশিও ৫০-৬০ এর আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে, যা গত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ঐতিহাসিকভাবে, যখন এই অনুপাত ৮০ বা তার বেশি থাকে, তখন রুপোকে সস্তা বা ‘আন্ডারভ্যালুড’ মনে করা হয়। কিন্তু বর্তমানের এই কম রেশিও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সোনার তুলনায় রুপো এখন বেশ দামী হয়ে গেছে।
বিনিয়োগকারীদের কী করা উচিত?
বর্তমান পরিস্থিতিতে রুপোয় বিনিয়োগ করার আগে যথেষ্ট সতর্ক থাকা প্রয়োজন। যখন বিশ্বজুড়ে কোনো প্যানিক বা ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়, তখন রুপোর দাম বাড়ে। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই বড়সড় ধস নামে।
- হুজুগে মাতবেন না: যখন সবাই কিনছে, তখন বাজারে ঢোকা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। স্মার্ট ইনভেস্টররা সাধারণত তখনই কেনেন যখন বাজার নিচে থাকে।
- ডাইভারসিফিকেশন: আপনার সমস্ত পুঁজি শুধুমাত্র রুপোতে না লাগিয়ে বিভিন্ন অ্যাসেট ক্লাসে ভাগ করে দিন।
- ঝুঁকি বুঝুন: বর্তমান বাজার অনেকটাই স্পেকুলেশন বা ফাটকাবাজির ওপর চলছে। তাই এই মুহূর্তে বিনিয়োগকে জুয়ার সামিল মনে হতে পারে। এক্সট্রিম ক্র্যাশ বা বড়সড় পতন থেকে বাঁচতে নিজের ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিন।
ডিসক্লেমার: এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যের জন্য এবং এটি কোনোভাবেই আর্থিক পরামর্শ বা ফিনান্সিয়াল অ্যাডভাইস নয়। বিনিয়োগ করার আগে অবশ্যই আপনার আর্থিক উপদেষ্টার সাথে পরামর্শ করুন।














