Trump Speech Controversy: সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর একটি নির্বাচনী প্রচারণামূলক ভাষণে কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করেছেন। বিশ্বের দুই শক্তিশালী নেতা—ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁকে নিয়ে তিনি যেভাবে প্রকাশ্যে বিদ্রুপ করেছেন, তা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্প শুধুমাত্র তাঁদের বাচনভঙ্গি নকলই করেননি, বরং তাঁদের সঙ্গে হওয়া ব্যক্তিগত কথোপকথনও অতিরঞ্জিতভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরেছেন।
প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রসঙ্গ
ট্রাম্প তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে দাবি করেছেন যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য অত্যন্ত বিনীতভাবে অনুরোধ করেছিলেন। তিনি মোদীর নকল করে বলেন, “স্যার, আমি কি আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারি?” যদিও ট্রাম্পের এই দাবির সত্যতা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
- অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ও ডেলিভারি: ট্রাম্পের অভিযোগ, ভারত আমেরিকা থেকে অ্যাপাচি অ্যাটাক হেলিকপ্টার কিনলেও তার ডেলিভারি প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর ছিল। তিনি দাবি করেন, তাঁর হস্তক্ষেপের পরেই আমেরিকা এফ-৩৫ এবং অ্যাপাচির মতো প্রতিরক্ষা সরঞ্জামগুলির সরবরাহ দ্রুত করেছে।
- বাণিজ্য ও তেলের রাজনীতি: ট্রাম্প চাইছেন ভারত পুরোপুরি আমেরিকার শর্ত মেনে চলুক। আমেরিকা ভারতীয় কৃষিক্ষেত্রে প্রবেশ করতে চায়, যা ভারত সরকার এখনও অনুমোদন করেনি। অন্যদিকে, আমেরিকার হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও ভারতের সরকারি তেল শোধনাগারগুলি রাশিয়া থেকে তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে। যদিও রিলায়েন্সের মতো কিছু বেসরকারি সংস্থা নিষেধাজ্ঞার ভয়ে রাশিয়ার তেল কেনা কমিয়ে দিয়েছে, যার প্রভাব তাদের শেয়ার বাজারেও পড়েছে। ভারত যে নিজের স্বার্থ রক্ষায় আমেরিকার চাপের কাছে মাথা নত করেনি, তা এই ঘটনাগুলি থেকে স্পষ্ট।
ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁকে ব্যক্তিগত আক্রমণ
ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, যিনি বয়সে ট্রাম্পের চেয়ে অনেকটাই ছোট, তিনিও ট্রাম্পের উপহাসের পাত্র হয়েছেন। ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ম্যাক্রোঁ তাঁকে সম্মান দিয়ে ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট’ না বলে সরাসরি ‘ডোনাল্ড’ বলে সম্বোধন করেন, যা তিনি পছন্দ করেন না।
- ওষুধের দাম বৃদ্ধি: ট্রাম্প ম্যাক্রোঁর বাচনভঙ্গি নকল করে দাবি করেন যে, ফরাসি রাষ্ট্রপতি নাকি গোপনে ফ্রান্সে ওষুধের দাম ২০০% বাড়াতে চেয়েছিলেন, যাতে জনগণ বিষয়টি বুঝতে না পারে।
- ট্রান্সজেন্ডার অ্যাথলিট প্রসঙ্গ: ওই একই ভাষণে ট্রাম্প একজন ট্রান্সজেন্ডার অ্যাথলিটকে নিয়েও কুরুচিকর মন্তব্য করেন, যা তাঁর বক্তব্যের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
ট্রাম্পের আচরণের নেপথ্য কারণ
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই আচরণের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে:
- জেফরি এপস্টাইন বিতর্ক: অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, জেফরি এপস্টাইনের গোপন ফাইল এবং তার সঙ্গে ট্রাম্পের সম্ভাব্য যোগসূত্র থেকে জনগণের নজর ঘোরাতেই তিনি ইচ্ছা করে এমন বিতর্কিত মন্তব্য করছেন।
- জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি: অদ্ভুতভাবে, ট্রাম্পের এই ‘বিদ্রুপাত্মক’ বা ‘ক্লাউন’ ইমেজ তাঁর জনপ্রিয়তা কিছুটা বাড়িয়েছে। তাঁর অ্যাপ্রুভাল রেটিং ৩৯% থেকে বেড়ে ৪২%-এ পৌঁছেছে, কারণ একাংশ মানুষ একে বিনোদন হিসেবে দেখছেন।
- অহংবোধ: হিন্দু শাস্ত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অসীম ক্ষমতা দুর্বল চিত্তের মানুষের মধ্যে অসীম অহংকারের জন্ম দেয়। ট্রাম্পের আচরণে সেই দম্ভেরই প্রকাশ ঘটছে।
ভারতের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
এই পরিস্থিতিতে ভারতের জন্য কূটনৈতিক পথটি বেশ জটিল। যদিও ট্রাম্পের মন্তব্য অপমানজনক, তবুও ভারত ও আমেরিকার মধ্যেকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। গুগল, মাইক্রোসফটের মতো আমেরিকান জায়ান্টরা ভারতে বিশাল বিনিয়োগ করে রেখেছে। তাই ভারত সরকার সম্ভবত এখনই কড়া প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে ধৈর্যের পরিচয় দেবে। ধারণা করা হচ্ছে, আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মিড-টার্ম ইলেকশন পর্যন্ত ট্রাম্পের এই অস্থির ও আক্রমণাত্মক আচরণ বজায় থাকবে, এবং ভারতকে সতর্কতার সঙ্গে এই সময়টি পার করতে হবে।














