WB Teachers TET: কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রক এবং রাজ্য স্কুল শিক্ষা দপ্তরের মধ্যে শিক্ষকদের যোগ্যতা সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান নিয়ে এক নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশিকার ওপর ভিত্তি করে, কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে জানতে চেয়েছে যে রাজ্যে ঠিক কতজন শিক্ষক বা শিক্ষিকা রয়েছেন যাদের টেট (Teacher Eligibility Test) বা সমতুল্য যোগ্যতা নেই। গত ৩১শে ডিসেম্বর, স্কুল শিক্ষা ও সাক্ষরতা বিভাগের যুগ্ম সচিব প্রাচী পান্ডে এই মর্মে রাজ্যের কাছে বিস্তারিত পরিসংখ্যান তলব করেছেন। এই নির্দেশের মূল লক্ষ্য হলো আদালতের রায়ের ফলে কতজন শিক্ষক প্রভাবিত হতে পারেন, তার একটি স্বচ্ছ ধারণা তৈরি করা।
কেন্দ্রের এই তলব রাজ্যের শিক্ষা দপ্তরে ব্যাপক তৎপরতা বাড়ালেও, তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিশেষত উচ্চ প্রাথমিক স্তরে বড়সড় জটিলতা দেখা দিয়েছে।
প্রাথমিক স্তরের চিত্রটা ঠিক কেমন?
প্রাথমিক শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহের কাজ অনেকটাই এগিয়েছে। জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদ (DPSC) এবং বিদ্যালয় পরিদর্শকদের (DI) মাধ্যমে ইতিমধ্যেই পঠনপাঠনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকদের তালিকা তৈরির কাজ হয়েছে।
বিকাশ ভবন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অন্দরমহল থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান উঠে এসেছে:
- রাজ্যে বর্তমানে প্রাথমিকে কর্মরত শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ ৪০ হাজার।
- এর মধ্যে প্রায় ৬০ হাজার শিক্ষক এমন রয়েছেন, যাঁদের নিয়োগ টেট পরীক্ষার মাধ্যমে হয়নি।
- এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষকের বড় অংশই ২০০৬ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে তৎকালীন নিয়ম মেনে ডিপিএসসির ১০০ নম্বরের ইন্টারভিউ বা পরীক্ষার মাধ্যমে নিযুক্ত হয়েছিলেন। ফলে তাঁদের টেট সংক্রান্ত নথি থাকার কথাও নয়।
উচ্চ প্রাথমিকে কেন তৈরি হয়েছে জটিলতা?
প্রাথমিকের হিসাব মোটামুটি পরিষ্কার হলেও, পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি বা উচ্চ প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের তথ্য আলাদা করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন। এর পিছনে মূল কারণ হলো রাজ্যের দীর্ঘদিনের পুরনো নিয়োগ পদ্ধতি।
একক পরীক্ষার সমস্যা:
১৯৯৮ সাল থেকে শুরু করে ২০১৬ সালের আগে পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে স্কুল সার্ভিস কমিশন (SSC) পঞ্চম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষক নিয়োগের জন্য একটিমাত্র অভিন্ন পরীক্ষা নিত। অর্থাৎ, পঞ্চম শ্রেণিতে যিনি পড়াচ্ছেন এবং দশম শ্রেণিতে যিনি পড়াচ্ছেন, তাঁরা একই প্যানেলভুক্ত হতেন। বর্তমান নিয়মে উচ্চ প্রাথমিক (পঞ্চম-অষ্টম) এবং মাধ্যমিক (নবম-দশম) স্তর আলাদা হলেও, পুরনো নথিতে এই বিভাজন করা কার্যত অসম্ভব।
‘নরমাল সেকশন’ ও প্যানেল বিভ্রান্তি:
যেহেতু পরীক্ষা এবং প্যানেল এক ছিল, তাই এখন হঠাত করে পুরনো নথিপত্র ঘেঁটে বের করা কঠিন যে কে শুধুমাত্র উচ্চ প্রাথমিকের জন্য নিযুক্ত আর কে মাধ্যমিক স্তরের জন্য। বিশেষত ‘নরমাল সেকশন’-এর শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এই পৃথকীকরণ আরও জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে টেট-উত্তীর্ণ নন এমন উচ্চ প্রাথমিকের শিক্ষকের সঠিক সংখ্যা নির্ণয় করা দপ্তরের কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ডিজিটাল পোর্টাল ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ
প্রশাসনিক আধিকারিকদের একাংশের মতে, বর্তমান যুগে তথ্যের অভাব হওয়ার কথা নয়। রাজ্যের শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের বেতন প্রক্রিয়া পরিচালিত হয় ‘আইওএসএমএস’ (IOSMS) পোর্টালের মাধ্যমে। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি শিক্ষকের নিয়োগ সংক্রান্ত খুঁটিনাটি সেখানে থাকার কথা।
তবে সমস্যা হলো, পোর্টালে ব্যক্তিগত তথ্য থাকলেও সামগ্রিকভাবে টেট-বিহীন উচ্চ প্রাথমিক শিক্ষকের তালিকা ফিল্টার করা বা যাচাই করা সময়সাপেক্ষ। বিশদে না খতিয়ে দেখে তাড়াহুড়ো করে কোনো সংখ্যা কেন্দ্রে পাঠানো সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন দপ্তরের কর্তারা। এই অনিশ্চয়তা এবং তথ্য সংগ্রহের ধীর গতি উচ্চ প্রাথমিকের শিক্ষক এবং প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে উদ্বেগের বাতাবরণ তৈরি করেছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও শিক্ষক সংগঠন
দিল্লি থেকে আসা চিঠিতে শুধু সংখ্যা নয়, এই সমস্যার সমাধানের পথ বা ‘পাথওয়ে’ (Pathway) সম্পর্কেও জানতে চাওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকার কেন্দ্রের কাছে কী আইনি পরামর্শ বা প্রস্তাব পেশ করে, তার ওপর নির্ভর করছে হাজার হাজার শিক্ষকের ভবিষ্যৎ।
শিক্ষক সংগঠনগুলির মতে, রাজ্যের উচিত খুব দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে এই ‘সেকশন সমস্যা’, আপার প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি স্তরের বিভাজন সংক্রান্ত জটিলতা কেন্দ্রের সামনে তুলে ধরা। যাতে কোনো ভুল তথ্যের কারণে আইনি গেরো তৈরি না হয় এবং শিক্ষকদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে। পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে আগামী দিনে রাজ্য শিক্ষা দপ্তরের পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।














