নয়াদিল্লি, ৩ মার্চ ২০২৬: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের জেরে স্ট্রেইট অফ হরমুজ প্রণালীতে তেলের চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (IRGC) ঘোষণা করেছে প্রণালী “বন্ধ” এবং যেকোনো জাহাজ পার হওয়ার চেষ্টা করলে তা “আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হবে”। গত ৪ দিন ধরে ট্যাঙ্কার চলাচল প্রায় থেমে গেছে। কয়েকটি জাহাজ কে আক্রমণ করে, এবং কয়েকজন নিহত হয়েছে, এবং শতাধিক জাহাজ আটকে আছে। আজ ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে এবং হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, এই পথে কোনো জাহাজ যাওয়ার চেষ্টা করলে তাতে তারা আক্রমণ করবে এবং ধ্বংস করে দিবে।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে কেন ভারতের জন্য চিন্তার কারণ?
হরমুজ প্রণালী হয়ে ভারতের প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় তেলের প্রায় ৫০-৫৫ শতাংশ আসে এই পথ দিয়ে। সৌদি আরব, ইরাক এবং কুয়েত থেকে তেল আসার একমাত্র রাস্তা এটিই। এছাড়াও ভারতের এলপিজি (LPG) আমদানির সিংহভাগ এই পথেই আসে।
হরমুজ প্রণালী কী
ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল পরিবহণ হয় যা বিশ্বজুড়ে প্রায় এক-চতুর্থাংশ তেল বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু, বিশ্ব বাণিজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ রুট হলো এই হরমুজ প্রণালী। একে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ “চোকপয়েন্ট” বা রাস্তার সন্ধিক্ষেত্র বলা হয় যা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে ইরান। এই প্রণালী বিশ্বজুড়ে জ্বালানি পরিবহনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হিসেবে পরিচিত। যদি এটি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে তেল পরিবহণের জন্য আর বিশেষ কোনো বিকল্প পথ খোলা থাকবে না।
ইরানের হরমুজ প্রণালী বন্ধের সিদ্ধান্তকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ‘অর্থনৈতিক আত্মহত্যা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এর আগে।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়াতে ভারতে পেট্রোল-ডিজেলের আকাল হবে কি?
হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলেও ভারতের তেল জোগানে সমস্যা হবে না বলে আজ সাংবাদিক বৈঠকে এ কথা জানান কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী। তিনি আরও জানান, গত কয়েক বছরে ভারতের তেল আমদানির উৎস বহুমুখী হয়েছে, এবং এখন আমাদের অনেক তেলই হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে না।
এছাড়াও এদিন তিনি বলেন, বর্তমানে ভারত সবচেয়ে বেশি তেল কেনে রাশিয়া থেকে। রাশিয়ার জাহাজগুলো বাল্টিক সাগর বা কৃষ্ণসাগর হয়ে আসে, যেগুলোর হরমুজ প্রণালী ব্যবহারের প্রয়োজনই পড়ে না। আমেরিকা, গায়ানা বা পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলো থেকেও ভারত প্রচুর তেল কেনে। এই জাহাজগুলো আটলান্টিক মহাসাগর ও ভারত মহাসাগর দিয়ে আসে, তাই হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলেও এদের পথে কোনো বাধা আসবে না।
যদিও ভারত পুরোপুরি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে তেল নেওয়া বন্ধ করেনি। ভারতের তেলের চাহিদার একটি বড় অংশ প্রায় ৫০-৫৫ শতাংশ এখনও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আসে। ওই দেশগুলোর জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালীই একমাত্র রাস্তা। আর যদি ততদিন না ওই পথ দিয়ে নতুন তেল এসে পৌঁছাচ্ছে ভারতে, ততদিন আমাদের দেশের ‘রিজার্ভ ট্যাঙ্ক‘ রয়েছে যেখানে ৪৫-৫৬ দিনের তেল মজুত আছে যা দিয়ে কাজ চালানো যাবে। এরপর সেই ঘাটতি পূরণ করতে ভারত রাশিয়া বা আমেরিকা থেকে বেশি বেশি করে তেল কিনবে।
প্রসঙ্গত, হরমুজ প্রণালী হলো তেল আমদানির সবচেয়ে সহজ ও সস্তা রাস্তা। এই পথ বন্ধ থাকার মানে হলো ভারতকে এখন অনেক দূর ঘুরে বিকল্প পথে তেল আনতে হবে। এতে জাহাজগুলোর পৌঁছাতে যেমন অনেক বেশি সময় লাগবে, তেমনি তেলের ভাড়ার খরচও কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। বিশেষজ্ঞের অনেকেই মনে করছেন, ভারত নিজের জমানো তেল দিয়ে আপাতত পরিস্থিতি সামাল দিলেও, সংকট যদি অনেক দিন ধরে চলে, তবে তেলের পেছনে দেশের খরচ অনেকটা বেড়ে যেতে পারে। আর আমদানি খরচ বাড়লে তার চাপ শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর পড়ার একটা ঝুঁকি থেকেই যায়। যার ফলে তেলের দাম বৃদ্ধি হবে বলে ধারণা করছেন। ইতিমধ্যেই ভারতীয় রুপির মান এক ডলারে ৯২ রুপিতে পৌঁছেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে এ সপ্তাহে এর পরিমাণ ডলারে ১০০ রুপিতে পৌঁছাবে।













